বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

রেকর্ড ১১৫ বিলিয়ন ডলারে ঋণ, তিন মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১২.৭৮%

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

রেকর্ড ১১৫ বিলিয়ন ডলারে  ঋণ, তিন মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১২.৭৮%

অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন (১১ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ।
এর মধ্যে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২০ পয়সা) অনুযায়ী টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৫ ৯০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার বিদেশি ঋণের যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ (১১৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলারে।
তিন মাস আগে মার্চ শেষে এই অঙ্ক ছিল ১১ হাজার ৯৩ কোটি (১১০.৯৩ বিলিয়ন) ডলার। ছয় মাস আগে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। আর এক বছর আগে জুন শেষে ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ছয় মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর এক বছরে বেড়েছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুনের শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ৫১০ কোটি ডলার। মার্চ শেষে ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার।
তবে একই সময়ে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ১৪ কোটি ডলার কমে ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ডলারে নেমেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুনের শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল দীর্ঘমেয়াদি। এর পরিমাণ ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
ঋণদাতার ধরন অনুযায়ী, জুন শেষে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ঋণ ছিল ১০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ছিল ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ছিল ২০ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে তা কমে ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ, ক্রেতাঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) এবং বাণিজ্যঋণ কমে যাওয়ায় এ খাতের মোট বৈদেশিক ঋণ কমেছে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সাল শেষে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে।
এরপর ২০২৪ সালে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে।
অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ নেওয়া অব্যাহত রাখে। ফলে ২০২৫ সাল শেষে বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

তিন মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১২.৭৮%
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক এপ্রিল-জুনে এসে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ খানিকটা বেড়েছে। এসময়ে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি।
আগের বছর ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার বিদেশি বিনিয়োগের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে।
এতে দেখা যায়, চলতি পঞ্জিকা বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে মোট এফডিআই এসেছে ১১১ কোটি ৩২ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৭৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার ফেরত নিয়ে গেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এতে করে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।
অপরদিকে ২০২৫ সালের একই সময়ে মোট ১০৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। এর মধ্যে ৭৮ কোটি ৭১ লাখ ডলার ফেরত নিয়ে গিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। ওই হিসাবে ওই সময়ে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে নিট নতুন বিনিয়োগ বা ইক্যুইটি এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে ইক্যুইটি এসেছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
এছাড়া এই তিন মাসে নিট এফডিআই ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলার এসেছে পুনর্বিনিয়োগ আয় থেকে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।
আর আন্তকোম্পানি ঋণ থেকে এসেছে ৮৬ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময় থেকে নিট নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আন্তকোম্পানি ঋণ থেকে বিনিয়োগ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
তবে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে নিট বিনিয়োগ ৫৫ দশমিক শূন্য শূন্য আট শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশের এফডিআইয়ের বড় অংশই আগে থেকে দেশে বিনিয়োগ করা কোম্পানির আয় পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে আসে।

প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে কম ২২.৪৪%
এই বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে মোট ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার ফেরত নিয়ে গিয়েছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
সেই হিসাবে গত জানুয়ারি–মার্চ সময়ে নিট এফডিআই এসেছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ছিল ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম।
হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিট এফডিআই ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে।
২০২৫ সালের এই তিন মাসে মোট ১৫৭ কোটি ৮৩ লাখ (১.৫৮ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। যার মধ্যে ৭৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার ফেরত নিয়ে গিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। ওই হিসাবে গত বছরের জানুয়ারি–মার্চ সময়ে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
দেশে কয়েক বছর ধরেই এফডিআই আসার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস–বিদ্যুতের সংকটসহ নানা বাধাবিপত্তির মধ্যেও গত বছরে নিট এফডিআই ৩৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল।
পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তকোম্পানি ঋণের ওপর ভর করেই মূলত বিদেশি বিনিয়োগে ওই বড় লাফ দেখা দেয়।
২০২৫ সালে ১৭৭ কোটি ৪ লাখ ডলারের নিট এফডিআই এসেছিল দেশে।
২০২৪ সালে এই অঙ্ক ছিল ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরে নিট এফডিআই বেড়েছিল ৫০ কোটি ডলার।

এম/আই

Link copied!