শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬

সড়ক নির্মাণ : ব্যয়ের স্বচ্ছতা চাই

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

সড়ক নির্মাণ : ব্যয়ের স্বচ্ছতা চাই

দেশে সড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে একই ধরনের সড়ক নির্মাণে কয়েকগুণ বেশি অর্থ লাগে- এমন আলোচনা প্রায়ই সামনে আসে। তবে শুধু কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের হিসাব দিয়ে এ ধরনের তুলনা করা যেমন পুরোপুরি যৌক্তিক নয়, তেমনি ব্যয় বেশি হওয়ার সব কারণকে কারিগরি বাস্তবতা বলে মেনে নেওয়াও সমীচীন নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, একটি সড়ক প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার কতটা অপরিহার্য এবং কতটা অদক্ষতা, বিলম্ব বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল।

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি সড়ক নির্মাণকে নিঃসন্দেহে ব্যয়বহুল করে তোলে। বদ্বীপ অঞ্চলের নরম মাটি, নিচু জমি, নদী-খালের আধিক্য, সেতু-কালভার্ট, ড্রেনেজ ও ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাটির ভার বহনক্ষমতা বাড়াতে গ্রাউন্ড ইমপ্রুভমেন্ট করতে হয়। আবার সড়ককে উঁচু করতে বিপুল পরিমাণ মাটি ভরাটের প্রয়োজন পড়ে। ফলে শক্ত ও সমতল জমিতে নির্মিত কোনো দেশের সড়কের সঙ্গে বাংলাদেশের সড়কের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় সরাসরি তুলনা করলে বাস্তবতার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

পেভমেন্টের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সড়কের শুধু ওপরের বিটুমিন নয়, নিচের বিভিন্ন স্তরের পুরুত্ব, মাটির ধরন এবং নির্ধারিত স্থায়িত্ব বিবেচনা করতে হয়। একইভাবে একটি প্রকল্পে সেতু, কালভার্ট, নদীশাসন, স্লোপ প্রটেকশন, ড্রেনেজ, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের ব্যয়ও থাকে। এসব ব্যয়কে শুধু মূল সড়ক নির্মাণের খরচ হিসেবে বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিক তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

কিন্তু এখানেই শেষ কথা নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা, রেট শিডিউল হালনাগাদে দেরি এবং বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণে ব্যয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। নির্মাণকাজের সঙ্গে গাড়ি, অফিস, জনবল, কনটিনজেন্সি, মূল্য সমন্বয় ও ভেরিয়েশনের মতো খাত যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয়ও ফুলে উঠতে পারে। এসব খাতে প্রয়োজন ও যৌক্তিকতার যথাযথ যাচাই না থাকলে সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাই সড়ক নির্মাণের ব্যয় নিয়ে বিতর্কের সমাধান শুধু ‘বাংলাদেশে ব্যয় বেশি’ অথবা ‘বাংলাদেশের বাস্তবতা আলাদা’- এই দুই বিপরীত অবস্থানের কোনো একটিতে নেই। প্রয়োজন একই ধরনের প্রকল্পের প্রকৃত তুলনা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতি লেন-কিলোমিটার, প্রতি বর্গমিটার, পেভমেন্টের পুরুত্ব, সেতু-কালভার্টের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের ব্যয় আলাদাভাবে প্রকাশ করা উচিত।

একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিস্তারিত নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ যতটা সম্ভব এগিয়ে নেওয়া দরকার। এতে বাস্তবায়ন পর্যায়ে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি কমবে। সওজের রেট শিডিউলও বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ঠিকাদারি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমদানিনির্ভর নির্মাণ উপকরণ। পাথর, বিটুমিনসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস, স্থানীয় সম্ভাবনা ও আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। যান্ত্রিকীকরণ ও উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে নির্মাণের গুণগত মান বজায় রেখেও ব্যয় কমানো সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। প্রকল্পের প্রতিটি খাতে বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোন ব্যয় কারিগরি কারণে অপরিহার্য, আর কোনটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে তৈরি- তার পৃথক হিসাব থাকা উচিত। বড় প্রকল্পে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

সড়ক দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই প্রয়োজনের জায়গায় ব্যয় করতে হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সুযোগ রাখা যাবে না। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ের বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ সড়ক উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য।

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!