২০২১ সালের ১৫ অক্টোবরের বিকেল। সমুদ্রসৈকতে ফুটবল খেলছিল একদল কিশোর। এরপর শুরু হয় দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি। আবদুল ছবুরের ছেলেও সেখানে খেলছিল। ছেলেকে আনতে তিনি সেখানে যান। পরে তাঁর চোখের সামনেই ছেলের সঙ্গে থাকা এক বন্ধুর বজ্রপাতে মৃত্যু হয়। ভাগ্যক্রমে তাঁর ছেলে বেঁচে যায়।
আবদুল ছবুরের বয়স প্রায় ৪০ বছর। তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা এলাকার বাসিন্দা। চোখের সামনে ছেলের বন্ধুকে মারা যেতে দেখে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। এরপরই বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে করণীয় কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে জানতে পারেন তালগাছ বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি কমায়। তাই তিনি নিজ উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় তালবীজ রোপণ করতে শুরু করেন। এর মধ্যে ২১ হাজার তালবীজ রোপণ করেছেন তিনি। ৩০ হাজার তালবীজ রোপণের লক্ষ্য রয়েছে তাঁর।
গত রোববার বিকেলে রায়পুর এলাকার দোভাষী বাজার-বাইন্যার দিঘি সড়কে গিয়ে কথা হয় ছবুরের সঙ্গে। তখন তিনি তালবীজ রোপণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁকে এলাকার প্রায় আটজন স্বেচ্ছাসেবী সাহায্য করছেন। তাঁদের কেউ মাটিতে গর্ত খুঁড়ছেন। আবার কেউ তালবীজ লাগাচ্ছেন।
আবদুল ছবুর জানান, বজ্রপাতে ছেলের বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনা কোনোভাবেই তিনি ভুলতে পারছিলেন না। ওই দিন থেকেই বজ্রপাত নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। মনের মধ্যে বহু ভাবনা এসেছিল তাঁর । একপর্যায়ে জানতে পারেন তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ করে। তখনই তিনি নিজের ইউনিয়নের প্রতিটি রাস্তায় তালবীজ রোপণের সিদ্ধান্ত নেন। গত বছর থেকেই তিনি এ কাজ শুরু করেছেন।
তালবীজ সংগ্রহ থেকে রোপণ পর্যন্ত সব তিনি নিজের টাকায় করছেন। তিনি মূলত চট্টগ্রামের নগরের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন নার্সারি থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। তিন থেকে পাঁচ টাকায় প্রতিটি বীজ কিনতে হয় তাঁকে।
আবদুল ছবুরের চট্টগ্রাম নগরে একটি মোটর ওয়ার্কশপ রয়েছে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। তাঁর সংসারে স্ত্রী ও তিন ছেলে রয়েছে। তালবীজ সংগ্রহ থেকে রোপণ পর্যন্ত সব তিনি নিজের টাকায় করছেন। তিনি মূলত চট্টগ্রামের নগরের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন নার্সারি থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। তিন থেকে পাঁচ টাকায় প্রতিটি বীজ কিনতে হয় তাঁকে।
গত বছর চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন আড়ত থেকে ১৩ হাজার তালবীজ কিনে লাগিয়েছেন। তবে বীজ রোপণের নিয়ম না জানায় সে বছর প্রায় অর্ধেক বীজ থেকে চারা গজায়নি। তাই এ বছর সঠিক নিয়মে বীজ লাগানো চেষ্টা করছেন। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এ কাজ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে চলতি বছর আট হাজার বীজ রোপণ করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রাথমিকভাবে ৩০ হাজার বীজ লাগাতে চান।
আবদুল ছবুরের ছেলে মো. আরিয়ানের বর্তমান বয়স ১৯ বছর। ছেলের যে বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে, তাঁর নাম মো. ফোরকান। ওই দিনের কথা মনে করে আবদুল ছবুর বলেন, ‘বৃষ্টি হওয়ায় আমি আমার ছেলেকে আনতে গিয়েছিলাম। আমার চোখের সামনে ফোরকানকে মরে যেতে দেখেছি। আমি ও আমার ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। এরপর বজ্রপাত কমাতে তালবীজ লাগানোর উদ্যোগ নিই।’
আবদুল ছবুর আরও বলেন, ‘চলতি বছর রায়পুর ইউনিয়নে তালগাছের পাশাপাশি ঔষধি গাছ লাগাব। প্রথম প্রথম অনেকে অনেক কথা বলত। এখন এলাকার তরুণ ও কিশোরেরাও আমাকে সহায়তা করছে। সব খরচ আমি বহন করছি। এ ধরনের উদ্যোগ আমি চালিয়ে যাব।’
আনোয়ারা উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরওয়ার আলম বলেন, ‘তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে বিশেষভাবে কার্যকরী। সে ক্ষেত্রে আবদুল ছবুরের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তালগাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এলাকায়, রাস্তার ধারে যত বেশি তালগাছ লাগানো যায়, ততই মঙ্গল।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, তালগাছ বজ্রপাত নিরোধে কার্যকরী—এটি বৈজ্ঞানিকভাবে খুব বেশি প্রমাণিত নয়। তবে তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক থেকে এটিকে বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক মনে করা হয়। তিনি বলেন, তালগাছ সাধারণত সড়কের পাশে লাগানো হয়ে থাকে। বৃষ্টি বা বজ্রপাতের লক্ষণ দেখা দিলে মানুষ এর নিচে আশ্রয় নিতে পারে। এর ফলে দেখা যায় যেসব এলাকায় তালগাছ রয়েছে, সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যু কম হয়। তাই বলা যায়, প্রাকৃতিকভাবে এটি বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় তালগাছ লাগানোটা এককথায় অসাধারণ উদ্যোগ। পরিবেশের পাশাপাশি জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তালগাছ। এভাবে ভালো কাজে সবাই এগিয়ে এলে সমাজ পরিবর্তন হবেই।’
