বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
তেহরানে সমাবেশ

ট্রাম্পের পরাজয়ে ইরানিদের উল্লাস আর উপহাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১০:০২ পিএম

ট্রাম্পের পরাজয়ে ইরানিদের উল্লাস আর উপহাস

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির হাত থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছেন। রিপাবলিকানদের এমন পরাজয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের সামনে আমেরিকা-বিরোধী বার্ষিক সমাবেশে সমবেত হয়ে উল্লাস করেছেন হাজার হাজার ইরানি।-সূত্র: এএফপি।

রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলের ওই সমাবেশ ‌‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগানে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ইরানের জাতীয় পতাকা নাড়ান এবং ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের তীব্র নিন্দা জানিয়ে লেখা নানা ব্যানার প্রদর্শন করেন।

সেখানে একটি বড় ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা এক ‘রক্তমাখা বুলডগ’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে; যার শিকলের অন্য প্রান্ত ধরে রেখেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো দেখতে শয়তানের অবয়বের এক চরিত্র।

অন্যান্য ব্যানারে ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পুরো অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি।

সমাবেশস্থলে টাঙানো এক বিশাল ব্যানারে লেখা রয়েছে, মূল্য কত হবে তা নির্ধারণ করেছে ইরানের জনগণ। এর ঠিক পাশেই পুরো বিশ্বের মানচিত্রজুড়ে কালো তেলের ড্রাম সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়ার প্রতীকী দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়।

১৯৭৯ সালে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং পরবর্তী জিম্মি করার ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে আয়োজিত এ সমাবেশে অংশ নিয়ে ৪০ বছর বয়সী মাহমুদখানি বলেন, ‘‘আমেরিকা বহু বছর ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানের কোনো ক্ষতিই তারা করতে পারেনি।’’

এই বিক্ষোভ সমাবেশ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যার ঠিক আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন ট্রাম্প। জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়, বারবার শুল্ক পরিবর্তন এবং ইরান সংঘাত নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষের কারণে মার্কিন এই নির্বাচনকে কার্যত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদী সরকারের ওপর একপ্রকার গণভোট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল।

মাহমুদখানি বলেন, ‘‘তেলের দাম এত বেড়ে যাওয়া নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই খুশি নই। তবে এতে অন্তত একটুখানি তৃপ্তি পাচ্ছি যে, আমরা এখন আর একা এই কষ্ট সইছি না। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে কেবল আমরা একাই তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে এসেছি।’’

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি পরিবহন পথে তেহরান নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করায় এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের প্রধান প্রধান বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে তার জবাব দিয়েছে।

মজিদ হেইদারি নামে ৬২ বছর বয়সী তেহরানের এক কাপড় প্রস্তুতকারক বলেন, জ্বালানি তেলের দাম চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়াটাই আমেরিকানদের ভোটাধিকারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একজোট হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন আমাদেরও এই বিশেষ হাতিয়ার (হরমুজ বন্ধের সিদ্ধান্ত) ব্যবহার করতেই হবে। তাদের নিজ দেশের জনগণকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ওই সরকারগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না।

তা সত্ত্বেও, আমেরিকার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সাধারণ ইরানিদের বাস্তব জীবনে আসলেই কোনো বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

৪২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদও প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমি সত্যি মনে করি, সেখানে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমাদের জন্য তার কোনো তফাৎ নেই। গত ৫০ বছর ধরে ইরানি জনগণের প্রতি মার্কিন সরকারের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব দুর্ভাগ্যজনকভাবে একই রয়ে গেছে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের বিষয়ে তেহরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জনগণের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, বিবেক থেকেই হোক কিংবা জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত খরচের কারণেই হোক, আমেরিকান জনগণ স্পষ্টভাবে ‘যুদ্ধকে না’ বলে দিয়েছে এবং আমরা তাদের এই বার্তাকে পূর্ণ সমর্থন জানাই।
আরও পড়ুন
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একটি কারণ ইরান যুদ্ধ, স্বীকার করলেন ট্রাম্প

তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক সংলাপ নতুন করে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার তীব্র শঙ্কার মাঝে খুব বেশি ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মার্কিন সমর্থিত শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের কয়েক মাস পরই তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে প্রথম হামলা চালানো হয়েছিল এবং এই বার্ষিক সমাবেশটি সেই স্মৃতিতেই প্রতিবছর আয়োজিত হয়।

সে সময় দূতাবাস ঘেরাওকারী ক্ষুব্ধ ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসারের চিকিৎসা নেওয়া শাহকে ইরানের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি করতে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছিল। তারা তৎকালীন ৫২ জন আমেরিকান নাগরিককে দীর্ঘ ৪৪৪ দিন টানা জিম্মি করে রেখেছিল এবং এই ঘটনার পরপরই ১৯৮০ সালে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ এরপর থেকে প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটিকে পশ্চিমা অহংকার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ প্রদর্শনের দিন হিসেবে মহা সমারোহে উদযাপন করে আসছে। বুধবারের বিক্ষোভে প্রদর্শিত এক রক্তভেজা রাজমুকুটের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘‘ফাঁকা মাথার ওপর অহংকারের মুকুট।’’

তেহরানের এক প্রাথমিক স্কুলের ৩৫ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষিকা বাঘেরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকা যেকোনো অবস্থাতেই আমাদের চরম শত্রু। সেখানকার হোয়াইট হাউসে কে ক্ষমতায় বসলো বা না বসলো, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।

জেএইচ

Link copied!