সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা

চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ

বিশ্বজুড়ে দ্রুত রূপান্তরশীল জনসংখ্যা ও চাকরি বাজারের অপ্রতুলতার কারণে আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে ১২০ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, যার বিপরীতে বাজারে সম্ভাব্য চাকরির সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪০ কোটি। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি তরুণের কোনো কর্মসংস্থান থাকবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপ-এর সভাপতি অজয় বঙ্গা।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার প্লেনারি সেশনে দেওয়া মূল ভাষণে অজয় বঙ্গা বৈশ্বিক অর্থনীতির এই করুণ ছবি তুলে ধরেন।

রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস এসব তথ্য জানায়। 

অজয় বঙ্গা বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়; এই সংখ্যাগুলোর পেছনে রয়েছে ডিগ্রি নিয়ে চাকরিহীন হতাশ তরুণী কিংবা কাজ জানা অথচ বিদ্যুৎ-সুবিধার অভাবে বেকার বসে থাকা যুবক। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মেধা ও ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন না করা হলে তা সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রধান উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালে তিনি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখনকার অর্থনৈতিক চাপ ও চ্যালেঞ্জগুলো এখনো কমেনি, বরং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, উচ্চ ঋণের বোঝা, সীমিত সরকারি তহবিল এবং শক্তি ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের চড়া মূল্যের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই বিরূপ হাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যাংক তার কাজের ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তিনি জানান, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃহৎ পরিসরে স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করাই এখন তাদের মূল কৌশল।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে অজয় বঙ্গা গত তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের অর্জিত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও গঠনমূলক সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ কাজের গতি বাড়াতে যেকোনো প্রকল্প অনুমোদনের সময় ১৯ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৯ মাসে আনা হয়েছে। এছাড়া আগের ১৫৩টি জটিল মূল্যায়নের বদলে মাত্র ২২টি প্রভাবকেন্দ্রিক সূচক চালু করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূলধন কাঠামোর পুনর্গঠনের ফলে আগামী এক দশকে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের (আইবিআরডি) ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির তিনটি মূল স্তম্ভের কথা উল্লেখ করে অজয় বঙ্গা বলেন, উন্নত পরিকাঠামো বা অবকাঠামো তৈরি, সুনির্দিষ্ট ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। গত এক বছরে বিশ্বব্যাংক ও এর সহযোগী মাধ্যমগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় ১১২০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগৃহীত হয়েছে, যা তিন বছর আগের তুলনায় তিনগুণ বেশি। সংগৃহীত এবং নিজস্ব তহবিল মিলিয়ে গত বছর মোট ২৩০০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সিংহভাগ অর্থই অবকাঠামো, শক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পর্যটনের মতো প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ব্যয় হয়েছে।

উন্নয়নশীল ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তির ছোঁয়া নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, ‘বিগ এআই’ বা বিশাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা হয়তো অনেক দেশের নাগালের বাইরে, কিন্তু ‘স্মল এআই’ বা সাধারণ প্রায়োগিক এআই এখন প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। একজন কৃষক যাতে ফলন বাড়াতে পারেন, একজন শিক্ষক যাতে শিক্ষার্থীকে আরও ভালোভাবে শেখাতে পারেন কিংবা একজন ছোট উদ্যোক্তা যাতে বড় বাজারে পৌঁছাতে পারেন-সেজন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ এবং প্রযুক্তি সরঞ্জাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জরুরি পরিষেবা পৌঁছানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি জানাতে গিয়ে অজয় বঙ্গা উল্লেখ করেন, ‘মিশন ৩০০’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকায় ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন। এর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের খাবার পানির নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাংক ৪০ কোটি মানুষকে কাভার করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। একইসঙ্গে ২০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে কেবল জীবনধারণের কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদনকারী কৃষকে পরিণত করতে বিশেষ উদ্যোগ কার্যকর করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে অজয় বঙ্গা বলেন, সেসময় বিশ্বযুদ্ধের মহামন্দার মধ্যেও বিশ্বনেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোনো দেশের সমৃদ্ধি কেবল তাদের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, তা প্রতিবেশী প্রতিটি ঘরকে উষ্ণ করে। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাংক বর্তমানে সরকারি তহবিল, বেসরকারি পুঁজি, দাতব্য সংস্থা ও নতুন প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে, যেন প্রতি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক পথনকশা তৈরি করে তরুণদের জন্য নতুন দিনের পথ উন্মোচন করা যায়।

এম/আই

Link copied!