অন্যের বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন, অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক এনআইডি নেওয়ার মতো প্রতারণা ঠেকাতে নতুন নীতিমালা তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে ভোটারের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা যুক্ত করে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সূত্র জানায়, সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে, অনেকে ২০০৮ সালে ভোটার হওয়ার পর ২০২৫ সালে আবার নতুন করে এনআইডির জন্য নিবন্ধন করে পরিচয়পত্র নিয়েছেন। আবার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রযুক্তির অপব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছেন। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি দেশে না থেকেও বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে ভোটার হয়েছেন। এসব প্রতারণা ঠেকাতে বায়োমেট্রিক তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহের জন্য একটি নীতিমালা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
এত দিন বায়োমেট্রিক তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এত দিন এ বিষয়ে সব নির্দেশনা ছিল মৌখিক। এবার সেগুলো লিখিত আকারে আনা হচ্ছে। নিয়ম না মেনে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
বায়োমেট্রিক তথ্য বলতে একজন নাগরিকের কোন তথ্যগুলোকে বোঝায়, জানতে চাইলে সূত্রটি জানায়, একজন নাগরিকের ছবি, চোখের আইরিস ও আঙুলের ছাপকে বায়োমেট্রিক তথ্য বলা হয়।
বায়োমেট্রিক প্রতারণার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি মেহেদী হাসান নামের এক ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে তিনটি এনআইডি নিয়েছিলেন। এসব এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৮২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন তিনি। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তিনটি এনআইডিই লক করে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে তদন্ত করে জানা যায়, মেহেদী হাসান প্রথম এনআইডি পেতে ২০০৮ সালে নিবন্ধন করেন। এরপর ২০২৪ সালে আবার আবেদন করে জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি নেন। সবশেষে ২০২৬ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তৃতীয় এনআইডি নেন তিনি। ২০২৪ ও ২০২৬ সালের ছবিও একই রকম। এখানেও বায়োমেট্রিক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।
ভোটারের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহে নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা বলেন, এসওপি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভালো কিছু করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
অন্যদিকে, ঢাকা মেইলের হাতে আসা এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জামালপুরের বকশীগঞ্জে এমন ৪২ জন ভোটার হয়েছিলেন, যাঁদের কেউই তাঁদের ঠিকানায় ছিলেন না। এমনকি তাঁরা কেউই সরাসরি অফিসে এসে ভোটার হননি। অন্যের বায়োমেট্রিক তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠানো স্থিরচিত্র ব্যবহার করে তাঁরা ভোটার হয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁদের সবার এনআইডি লক রয়েছে। এঁদের ভোটার করার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওই সময়ে নতুন ভোটার নিবন্ধন, স্থানান্তর ও মৃত ভোটারকে জীবিত দেখানোসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানের দায়িত্বে থাকা ডেটা এন্ট্রি অপারেটর (আউটসোর্সিং) তাহমীদ হাসান।
এ বিষয়ে তাহমীদ হাসান জানান, ওই ৪২ জনের কেউই সরাসরি উপজেলা নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হয়ে নিবন্ধন করেননি। এমনকি তাঁদের নিবন্ধনের বিষয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অবগতও ছিলেন না। চক্রের সদস্যরা বিষয়টি গোপন রাখতেন। তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে শুধু ডেটা তৈরি করে আপলোড করতে বাধ্য করা হতো।
তিনি আরও জানান, ওই ৪২ জনের কেউ আগে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন না এবং তাঁদের নিবন্ধনের জন্য কোনো ফরমও পূরণ করা হয়নি। শুধু সাদা কাগজ স্ক্যান করে দেওয়া হতো। নিবন্ধিত এসব ভোটার ২০১৯ সালের হালনাগাদ কার্যক্রমের অতিরিক্ত ডেটার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যে বিষয়ে চক্রের সদস্যরা অবগত ছিলেন। এসব ডেটা আপলোডের ক্ষেত্রে সিএমএসে কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হতো না। তবে কীভাবে অনুমোদন ছাড়াই এসব ডেটা আপলোড করা সম্ভব হতো, তা তাঁর জানা নেই।
বায়োমেট্রিক তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, চক্রের সদস্যরা ভোটারের স্থিরচিত্র ব্যবহার করে ছবি সংগ্রহ করতেন। বায়োমেট্রিক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য পুরোনো ডেটা থেকে নেওয়া হতো।
ওই সময়ে বকশীগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, উল্লিখিত ৪২ জনের ভোটার নিবন্ধন হয়নি। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে সংরক্ষিত নতুন ভোটার নিবন্ধন রেজিস্টারেও তাঁদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই ৪২ জনের নিবন্ধন ফরম-২ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিও পাওয়া যায়নি। তাঁদের এনরোলমেন্ট, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও আপলোডের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
এসব প্রতারকের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, যারা প্রতারণা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যায়কে ছাড় দেওয়া যাবে না।
বায়োমেট্রিক প্রতারণা ঠেকাতে ইসির সম্ভাব্য পদক্ষেপ:
১. আবেদনকারী সশরীরে উপস্থিত না হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য ছাড়াই ভোটার নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. উপজেলা ক্লায়েন্ট সার্ভারে সংরক্ষিত পুরোনো ডেটা ব্যবহার করে অবৈধ নিবন্ধন বন্ধে ওই ডেটা যাচাই-বাছাই করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর সেগুলো মুছে ফেলা।
৩. তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) শাখার মাধ্যমে ওই ডেটার অপব্যবহার রোধে বিকল্প সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে সতর্ক করা। একই সঙ্গে ডেটা আপলোডের সময় উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা কর্তৃক অনুমোদিত নিবন্ধন ফরমের হার্ড কপির সঙ্গে আপলোড করা প্রতিটি ফরম মিলিয়ে দেখা এবং তা নিজ হাতে আপলোড করা।
৫. অবৈধ নিবন্ধন রোধে প্রবাসী নিবন্ধনের মতো দেশের আবেদনকারীদের নিবন্ধন ফরমের সঙ্গে পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংগ্রহ করা। উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা নিবন্ধনের অনুমোদন দেওয়ার সময় ফরম ও ছবির একটি অংশে স্বাক্ষর করবেন, এমন বিধান চালু করা।
৬. আপলোডার সফটওয়্যারে শুধু ফরম নম্বর ও নামসহ ছবি দেখার ব্যবস্থা।
