শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
পর্যটনের নামে মৃত্যুফাঁদ!

কক্সবাজার–সেন্টমার্টিনে হোটেল-রিসোর্ট ও নৌযানের নিরাপত্তা তদারকি কোথায়?

কক্সবাজার থেকে ফিরে কামাল পারভেজ

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

কক্সবাজার–সেন্টমার্টিনে হোটেল-রিসোর্ট ও নৌযানের নিরাপত্তা তদারকি কোথায়?

কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন—দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিবছর হাজারো পর্যটক সমুদ্র, সৈকত ও প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসব এলাকায় ছুটে যান। কিন্তু পর্যটনের এই সম্ভাবনার আড়ালে বারবার সামনে আসছে অগ্নিকাণ্ড, নৌযানের নিরাপত্তা, আবাসিক স্থাপনার অনুমোদন এবং পর্যটকদের প্রাণহানির মতো উদ্বেগজনক ঘটনা। সর্বশেষ কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি একটি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। এ ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে?
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও সেগুলোর অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, উদ্ধারব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শন কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী নৌযানের ফিটনেস, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন কিংবা তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্যেই প্রশাসনিক দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?:
পর্যটন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা আবাসিক স্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে—কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এসব হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালিত হচ্ছে? ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে কি?
বিশেষ করে কাঠের তৈরি রিসোর্ট, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক স্থাপনা এবং সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ ধরনের স্থাপনায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সরঞ্জাম থাকা জরুরি।
তবে সব হোটেল-রিসোর্ট অননুমোদিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি স্থাপনার অনুমোদন, লাইসেন্স ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সরকারি নথি এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। পর্যটন করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার আইনগত দায়িত্বও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিনে রিসোর্টের অনুমোদন, পর্যটকের নিরাপত্তা কোথায়?:
সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চললেও দ্বীপে পরিচালিত হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য পর্যটনসেবার অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। দ্বীপটির সীমিত অবকাঠামো, সুপেয় পানির সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় পর্যটন পরিচালনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তা-ও পর্যালোচনা করা দরকার। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিসোর্টের অনুমোদন যাচাইয়ের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি যোগাযোগ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং উদ্ধার পরিকল্পনা বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পর্যটকবাহী জাহাজের নিরাপত্তা যাচাইয়ের দাবি:
২০২৬–২০২৭ পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী সব জাহাজের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, সার্ভে সনদ, লাইসেন্স, রুট পারমিট, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম জরুরিভিত্তিতে যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
গত পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাটে যাত্রী ওঠানোর আগে একটি পর্যটকবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে যাত্রা শুরুর আগেই নিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত করা প্রয়োজন।
প্রতিটি জাহাজের অনুমোদিত যাত্রী ধারণক্ষমতা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন, যাত্রী ও ক্রুর প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত করা, লাইফ জ্যাকেট ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও যোগাযোগ সরঞ্জাম পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ কিংবা গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে টিকিট বিক্রি, যাত্রী তালিকা, জাহাজের লগবুক এবং দ্বীপে যাত্রীদের যাওয়া-ফেরার হিসাব মিলিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে টিকিট বিক্রির ঘটনা ঘটলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পর্যটকসংখ্যা বাড়ানো নয়, পরিবেশগত ধারণক্ষমতা যাচাই জরুরি:
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সেন্টমার্টিনে পর্যটনের সময়সীমা, পর্যটকসংখ্যা এবং পর্যটকবাহী জাহাজ ছাড়ার স্থান পুনর্বিবেচনার কথা জানিয়েছেন। ২০২৬–২০২৭ পর্যটন মৌসুমে পর্যটক গমন ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা হয়েছে।
বিদ্যমান নির্দেশনা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা দিনে দ্বীপ ভ্রমণ করে একই দিনে ফিরে আসবেন, রাত্রিযাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাত্রিযাপনের সুযোগ রয়েছে। দৈনিক পর্যটকসংখ্যা গড়ে দুই হাজারের বেশি না রাখার বিধান রয়েছে এবং ফেব্রুয়ারিতে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব বিধান পুনর্বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলা হয়েছে।
তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর আগে দ্বীপের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বিবেচনায় দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের সীমা বহাল রাখা, এমনকি প্রয়োজনে তা কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
কঠোর আইন প্রয়োগ ও সমন্বিত তদারকির আহ্বান:
জলবায়ু ও পরিবেশবিদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর ট্রেজারার আমিনুর রসুল বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণ ও কক্সবাজার রুটে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। পর্যটক পরিবহনে ব্যবহৃত নৌযানের বৈধ অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং যাত্রী ধারণক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, পর্যটনের সময়সীমা, রাত্রিযাপন ও দৈনিক পর্যটকসংখ্যার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমানে দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের সীমা না বাড়িয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনে তা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় পর্যটন মৌসুম নির্ধারণ এবং মৌসুম শুরুর আগেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে।
আমিনুর রসুলের মতে, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, নৌ-বাণিজ্য দপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ আইনগত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনা থামবে কীভাবে?
কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা, নৌযানের ফিটনেস ও যাত্রী ধারণক্ষমতা, বৈধ টিকিট বিক্রি এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও সমন্বয় নিশ্চিত করে দুর্ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণে জোর দিতে হবে। পর্যটন ব্যবসার প্রসার যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনি পর্যটকদের জীবন রক্ষার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সেবাদাতাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
পর্যটনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন কাউকে প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য অনুমোদন যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। প্রশ্নটি তাই শুধু দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, তা নয়—দুর্ঘটনা ঠেকাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কী করছে এবং ব্যর্থতার দায় কে নেবে?

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!