চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এই পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আইএমএফের পূর্বাভাস বাস্তবে ঘটলে তা হবে ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতি নিয়ে পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বার্ষিক সভা উপলক্ষে এটি প্রকাশ হয়েছে। এ বছর আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সরকারের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কভিড মহামারির সময়ে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশনা ‘পঞ্চাশ বছরের জাতীয় পরিসংখ্যান’-এর তথ্য অনুযায়ী ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরেও একই হারে প্রবৃদ্ধি হয়। ওই সময় দেশে প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়।
আইএমএফ মনে করছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হবে। ওই অনুমান সত্যি হলে তা হবে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিবিএসের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে গড়ে ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়। এরপর কোনো কোনো মাসে এর চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হলেও তা এক বছরের গড় নয়।
গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কয়েকদিন আগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। আর গত মাসে এডিবির পূর্বাভাসে ৪ শতাংশের কথা বলা হয়। আইএমএফ যখন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের একটু বেশি ধরেছে, তখন একই সময়ে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত এপ্রিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ধারা ও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী পূর্বাভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিবিএসের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
সহযোগিতা চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বার্ষিক সম্মেলনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি আইএমএফের নিরাপত্তা পরিচালক উরজিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিয়ের্দের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস এবং সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অন্য কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না সরকার। সংস্থাগুলো নিজ নিজ হিসাব ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পূর্বাভাস দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যাবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কারও প্রক্ষেপণকে বিতর্কিত করতে চাই না। এটা তাদের হিসাবে তারা দিয়েছে। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি, তারা তাদের মতো করছে। আমাদের মধ্যে যে সহযোগিতা দরকার, সেই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে– এটাই মূল কথা।’
গত জুনে বাজেট ঘোষণার সময় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা না থাকলেও আইএমএফ আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়লে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আয় বৃদ্ধির গতি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।
বিশ্বব্যাংকের এমডির সঙ্গে বৈঠক
আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেতে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করা হবে। ঋণ সহায়তা পেতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং প্রকল্প অনুমোদনের সময় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
বৈঠকে থাকা বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান. বর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়ে সাত বছর লাগে। এটি কমিয়ে পাঁচ বছরে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় গড়ে ১৮ মাস লেগে যায়। এটি আট মাসে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার বিষয়ে আলোচনা চলছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বার্ষিক সভা চলাকালীন এখানে আলোচনা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আলোচনার ভিত্তিতে একটা ফলোআপ হবে। এটা একটা প্রক্রিয়া, যা আগামী কয়েক মাস চলবে। আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুই পক্ষের করণীয় ও সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। এ নিয়ে ঢাকাতেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের নেওয়া নীতির সঙ্গে সংস্থাটি একমত।
