শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে রেকর্ড

তিন মাসেই আয় ছাড়াল ১০ বিলিয়ন ডলার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

তিন মাসেই আয় ছাড়াল ১০ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী দেশগুলোয় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও রপ্তানি বেড়েছে বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাকশিল্পের। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক বা প্রথম তিন মাসেই এ খাতের রপ্তানি আয় সাড়ে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৫৬ শতাংশ। এই এক মাসে রপ্তানি আয় এসেছে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও বায়ারদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চান তারা। এজন্য সরকারের কিছু নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংযোগের কোনো বিকল্প নেই।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র জানায়, বছরে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাতকেই কম-বেশি ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের উৎস হিসেবে মনে করা হয়। গেল অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট রপ্তানি আয় আসে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয় ৩৮.৭০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চলতি অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন অতিক্রমের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এবার লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা এগিয়েছে রপ্তানি বাণিজ্য।

এই তিন মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ১৩.০৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আয় হয়েছে ১০.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গেল বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে মোট রপ্তানি আয় এসেছিল ১২.৩১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবৃদ্ধির হিসাবে এ বছর ৬.৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ১৩.৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানি আয় এসেছে ৩.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, রপ্তানিমুখী দেশগুলোয় বড় মৌসুম শুরু হয়েছে। এর বাইরে দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে। এতে উদ্যোক্তারা যেমন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারছে, অন্যদিকে বায়াররাও আস্থা ফিরে পেয়েছেন। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থায়ও বিকল্প রুট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বায়াররা।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে রপ্তানি বাণিজ্য এখন ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু এখানে একটি সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে। সরকার শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে অনেক ছোটখাটো কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কোথাও কোথাও অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। তার মতে, অতীতে যতবার মজুরি বাড়ানো হয়েছে, এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা লেগেছে। তাই সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

আকারে ছোট হলেও বছরের অন্যান্য সময়ের মতো এই প্রান্তিকেও তৈরি পোশাকের চেয়ে রপ্তানিতে এগিয়ে রয়েছে নিটপণ্য। সেপ্টেম্বর মাসে ১.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ওভেন পণ্যের বিপরীতে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এছাড়া গত তিন মাসে নিটওয়্যার খাত থেকেই রপ্তানি আয় এসেছে ৫.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, অনেক প্রতিযোগিতা ও বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তৈরি পোশাকের মতো টেক্সটাইল খাতও এগিয়ে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় অন্তত শিল্প খাতে জ্বালানির নিশ্চয়তার পাশাপাশি সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। তাহলেই তৈরি পোশাকের মতো টেক্সটাইলশিল্পও একদিন দেশের জাতীয় অর্থনীতির হাল ধরবে।

এদিকে, বড় বড় শিল্প গ্রুপ যেমন সরাসরি বায়ারদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে দেশের রপ্তানি আয়ে ভূমিকা রাখছে, তেমনি আয়ের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই সাব-কন্ট্রাকে কাজ করা ছোট গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও। এক্ষেত্রে নীতিমালার মাধ্যমে এসব গার্মেন্ট কারখানাগুলোকে নীতি সহায়তা দেওয়া হলে উৎপাদন ও রপ্তানি আরো বাড়বে বলে মনে করেন বিজিএমইর পরিচালক এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

তিনি জানান, ব্যাংকিং সেক্টরে অস্থিরতাসহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করে টিকে আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা রপ্তানি সুবিধা পাচ্ছে না। তাই সরকারের উচিত এ দিকটা একটু ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা। তাহলে রপ্তানি বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। তাই আগামী দিনগুলোয় যেন ইউটিলিটি পরিস্থিতি আরো খারাপ না হয়, সরকারকে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্ট মাস থেকে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক পোশাক বাণিজ্যের প্রি-স্প্রিং এবং স্প্রিং মৌসুমের অর্ডার। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে জ্যাকেট, প্যান্ট, শট ও লং ট্রাউজার; জগিং স্যুট, লং প্যান্ট, লং স্লিভ টিশার্ট, উইন্ড ব্রেকার এবং হুডির মতো কিছুটা কম দামের পোশাকের।

বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা মূলত এই কম দামের পোশাক রপ্তানিতেই অভ্যস্ত। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে সবচেয়ে বড় এই মৌসুমের অর্ডার-উৎপাদন ও শিপমেন্টের কাজ। তাই আগামী দিনগুলোয়ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু তার জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী।

এম/আই

Link copied!