বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

বিপুল বিনিয়োগের পরও সংকটে পায়রা বন্দর, ফের ড্রেজিংয়েই ভরসা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

বিপুল বিনিয়োগের পরও সংকটে পায়রা বন্দর, ফের ড্রেজিংয়েই ভরসা

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান জান ডি নুল ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৬ হাজার ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করে।

প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রা সমুদ্র বন্দরকে সচল করতে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বন্দর কার্যকর করতে চ্যানেলে ১২ লাখ ঘনমিটার পলি মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করে নাব্য ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এজন্য ৪ হাজার ৬শ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষমান। 

কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে চ্যানেলের গভীরতা বাড়িয়ে পায়রা বন্দর সচল করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে একই সাথে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান জান ডি নুল ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৬ হাজার ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করে। তবে তার পরবর্তী দুই বছর চ্যানেলে কোনো ড্রেজিং না হওয়ায় পলি জমে মারাত্মক নাব্যতা সংকটে পড়ে। 

পায়রা বন্দরের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের চার্ট বিশ্লেষণে কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে চ্যানেলের বর্তমান গড় গভীরতা নেমে এসেছে মাত্র ৫.৪ থেকে ৫.৯ মিটারে। অবস্থানভেদে ও জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ ড্রাফট (গভীরতা) পাওয়া যাচ্ছে ৬.৫ মিটার। যদিও ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরুর আগেই রাবনাবাদ চ্যানেলের স্বাভাবিক গভীরতা ছিল ৫.৬ মিটার।

জানা গেছে, পায়রা বন্দর চালুর এক দশকে কাস্টমস ও বন্দর মাশুল বাবদ ১ হাজার ৯০৭ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। ব্যবহারের দিক থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি বড় জাহাজ আসে ১১১টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আসে ১২৩টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আসে ৮৫টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসেছে মাত্র ২৯টি বিদেশি জাহাজ। মার্চ মাসে বন্দরের বহির্নোঙরে আসে কয়লাবোঝাই এমভি থেরেসা গ্রেস জাহাজ। গভীরতা না থাকায় ইন্দোনেশিয়ার জাহাজটি বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড়ছে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেডে কয়লা খালাস করে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনা হচ্ছে। যদিও দুই বছর বিরতির চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনালে ভিড়েছে চীনের পতাকাবাহী জাহাজ ‍‍`ফান ঝউ-৬‍‍`। বন্দরের জন্য কেনা ৫টি কার্গো হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে জাহাজটি সরাসরি টার্মিনালে নোঙর করে।

ড্রেজিং করে চ্যানেলের নাব্যতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারলে ফান ঝউ-৬ এর মত মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি টার্মিনালে আসতে পারবে বলেও মনে করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, পায়রা বন্দরকে পুরোপুরি চালু করার পর এর আয়-ব্যয় পর্যালোচনা করা উচিত। সেই সাথে প্রতিটি প্রকল্পের উপকারিতা পর্যালোচনা করা উচিত।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস বলেন, ‍‍`পায়রা বন্দর যেহেতু একটি পর্যায়ে এসেছে এখন সেটিকে চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। প্রতিষ্ঠানটি তো এখন বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব না। যদি এডিশনাল বিনিয়োগ দরকার হয় অন্তত সেটি করে হলেও সচল করার পরে এর আয়-ব্যয়ের পর্যালোচনা করা সম্ভব।

এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প কোন না কোনভাবে ঋণ নিয়ে করা। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেই যে ঋণ শোধ হয়ে যাচ্ছে এমন না ঋণ কিন্তু জনগণকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। যে কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে প্রতিষ্ঠান সচল না করতে পারলে ঋণ তো আরো বাড়তে থাকবে। বন্দর সচল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিতে হবে, আবার কোনো কাজ নিয়ে যেন প্রশ্ন দানা না বাঁধে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, ‍‍`পায়রা বন্দরে চ্যানেলর নাব্য সংকট বহুল আলোচ্য বিষয়। এর আগেও বিপুল অর্থ ব্যয় করে ড্রেজিং হয়েছে। সেটির কি উপকারিতা এসেছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। আগের কাজের পর্যালোচনা না করে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় টাকার শ্রাদ্ধ করার কোনো মানে হয় না।‍‍`

তিনি বলেন, ‍‍`প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতার পরেই নতুন কাজ হাতে নেওয়া উচিত। নয়তো লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের সম্পদ চাইলেই কেউ কিছু করে হিসেব না দিয়ে যেতে পারেন না। আমি মনে করি বন্দর সচল রাখতে ধারাবিাহক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। দু-তিন বছর পর পর ড্রেজিংয়ের বিশাল বাজেট না ধরে প্রতি বছর ড্রেজিং অব্যাহত রাখলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বন্দর স্বাভাবিক ও ব্যবহারযোগ্য রাখা সম্ভব।‍‍`

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম মনে করেন, ‍‍`রামনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং সম্পন্ন হলে চ্যানেলের সক্ষমতা আরো বাড়বে। বন্দরের অন্যান্য কোর পোর্ট ফ্যাসিলিটিজ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ায় ড্রেজিং শুরু হলে অতিরিক্ত চার মিটারের মধ্যে কয়লাবাহী মাদার ভেসেলের পাশাপাশি কার ক্যারিয়ার, খাদ্য, সার এবং নির্মাণসামগ্রীবাহী জাহাজ বন্দরে প্রবেশের প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে নাব্যতা নিয়ে পুনরাবৃত্ত সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।‍‍`

এম/আই

Link copied!