বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

রূপালী ব্যাংকে তুঘলকি কাণ্ড!

কাজী আশরাফ এলাহী

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৯:১৫ এএম

রূপালী ব্যাংকে তুঘলকি কাণ্ড!

রিয়েল এস্টেট খাতের প্রতিষ্ঠান পূর্বাচল হেভেলি সিটি লিমিটেড-এর অ্যাকাউন্টে জমা ছিল মাত্র ৬ হাজার টাকা। সেই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে দেওয়া একটি চেকের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে ২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের পল্লবী শাখায় খোলা প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে চেকটির বিপরীতে এত বড় অঙ্কের পেমেন্ট হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


চেকটি প্রথমবার জমা দেওয়ার পর দুবার ডিজঅনার হলেও তৃতীয়বার জমা দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারিং ব্যবস্থা ব্যাচের (BACH) মাধ্যমে ২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। এ ঘটনায় রূপালী ব্যাংক কারিগরি ত্রুটির কথা বলছে। অন্যদিকে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখার দাবি, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই চেকের টাকা গ্রাহকের হিসাবে জমা করা হয়েছে।


ব্যাংক দুটির কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে পেমেন্ট বন্ধের অনুরোধ, ইমেইল পাঠানোর সময় এবং টাকা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি।
রূপালী ব্যাংকের পল্লবী শাখায় ২০২৫ সালে Purbachal Haveli City Ltd-এর নামে একটি স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট (SND) অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ আউয়াল।


প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টের বিপরীতে চেকটি দেওয়া হয় আল-আরাফা ব্যাংকের ডিরেক্টর, কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানকে। গত ২৪ আগস্ট চেকটি আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখায় জমা দেওয়া হয়। প্রথম দুবার চেকটি ডিজঅনার হওয়ার পর ২০ সেপ্টেম্বর পুনরায় জমা দেওয়া হলে ব্যাচের মাধ্যমে ২ কোটি টাকার পেমেন্ট সম্পন্ন হয়। অথচ ওই সময় রূপালী ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ৬ হাজার টাকা।


ছোট লেনদেনের অ্যাকাউন্ট, বড় অঙ্কের চেক
অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর পূর্বাচল হেভেলি সিটি লিমিটেড-এর নামে গ্রাহক মাত্র ২ হাজার টাকা জমা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এরপর চলতি বছরের ২ আগস্ট ওয়ান ব্যাংক থেকে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি)-এর মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা জমা করা হয়। ৬ আগস্ট ফরিদুল ইসলাম নামে একজন ৫০ হাজার টাকা তুলে নেন।
পরবর্তী সময়ে ৩ সেপ্টেম্বর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে লিপি আক্তার ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা জমা দেন। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর জাহিদুল ইসলাম নামে একজন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নেন।
অ্যাকাউন্টের তথ্য অনুযায়ী, খোলার পর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত এতে মোট ২ লাখ ১৪ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এর বিপরীতে উত্তোলন করা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। ফলে অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৪ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, অ্যাকাউন্টটিতে অল্প অঙ্কের লেনদেনের তথ্য থাকলেও এর বিপরীতে দেওয়া একটি চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে ২ কোটি টাকা।
ব্যাচের মাধ্যমে কীভাবে হয় চেকের লেনদেন।
ব্যাচ (BACH) হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি স্বয়ংক্রিয় চেক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থা। এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের চেক জমা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চেকটি ক্লিয়ারিংয়ের জন্য পাঠায়। এরপর চেকের সত্যতা, স্বাক্ষর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে ব্যাংকগুলোর হিসাব সমন্বয় করা হয়। প্রক্রিয়া শেষে চেক জমা নেওয়া ব্যাংক তার গ্রাহকের হিসাবে টাকা জমা করে।
তবে Purbachal Haveli City Ltd-এর অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে চেকটির বিপরীতে ২ কোটি টাকার পেমেন্ট সম্পন্ন হলো, সেটিই এখন দুই ব্যাংকের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
ব্যাংকাররা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের প্রশ্ন, অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েক হাজার টাকা থাকা অবস্থায় কীভাবে ২ কোটি টাকার চেকের পেমেন্ট হলো? একই চেক দুইবার ডিজঅর্নার হয়ে তৃতীয়বার কীভাবে পাস হলো, সেটিও তদন্তের বিষয়।


রূপালী ব্যাংকের পল্লবী শাখার বক্তব্য
রূপালী ব্যাংকের পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক রাজ্জাকুল হায়দার বলেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর গ্রাহকের চেকের বিপরীতে যে পেমেন্ট হয়েছে, তা ডিজিটাল বা কারিগরি ভুলের কারণে হয়েছে। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখায় ফোন করে পেমেন্ট বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়।
তিনি বলেন, “বিষয়টি জানার পরই 20 সেপ্টেম্বরই আল-আরাফা ব্যাংককে বিকাল ৫.১১ টার সময়ে মেইল করে পেমেন্টটি বন্ধ করার জন্য জানানো হয়েছে। এছাড়া পরদিন সকাল ১০টার আগেই লিখিত চিঠি পৌঁছে দিয়ে রিসিভ কপি সংগ্রহ করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে।”
রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বনানী শাখার ব্যবস্থাপক জানান, গ্রাহক টাকা তুলে নিয়েছেন। তবে রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান করে জানা যায়, ওই দিনও গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে মোট ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি ব্যালেন্স ছিল এবং টাকা তোলা হয়নি বলে দাবি করা হয়।
পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক আরও বলেন, ২২ সেপ্টেম্বর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ইমেইলে জানায়, গ্রাহকের অন্যান্য হিসাব টাকা আটকে রাখা যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, ২১ সেপ্টেম্বর পেমেন্ট বন্ধের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও খলিলুর রহমানকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে ব্যাংকিং বিধিমালার গুরুতর লঙ্ঘন বলে দাবি করেন তিনি।
রূপালী ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে গঠিত আরবিট্রেশন বোর্ডের বৈঠকে রূপালী ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান, জেনারেল ম্যানেজার, চিফ লিগ্যাল অফিসার ও আইনজীবী উপস্থিত থেকে তাঁদের তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেন।


আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের বক্তব্য
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখার ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন, তাঁদের শাখার গ্রাহক খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে Purbachal Haveli City Ltd-এর কাছে টাকা পেতেন। এর আগে চেকটি দুবার ডিজঅনার হয়েছিল।
তিনি বলেন, যেদিন চেকটি পাস হয়, সেদিন সকালে তাঁদের গ্রাহক ব্যাংককে জানান যে চেকটি আজকে পাস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অবহিত করার অনুরোধও জানান তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং গাইডলাইন অনুযায়ী, ভুলবশত চেক পাস হলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার আগে দাবি জানানো হলে তা ফেরত দেওয়া সম্ভব। কিন্তু একবার গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা চলে হয়ে গেলে তা রিকভারী করা কিছুটা সময় সাপেক্ষ।
তিনি বলেন, “ক্লিয়ারিং রিফান্ডের নির্ধারিত কাটঅফ সময় ছিল দুপুর ২টা। অথচ রূপালী ব্যাংক বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে ইমেইল করায় তার আগেই টাকা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায়।”
রূপালী ব্যাংকের কারিগরি ত্রুটির দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, “রূপালী ব্যাংক থেকে আমাদের এটিকে কারিগরি ত্রুটি বলে দাবি করা হয়। যদিও কারিগরি সমস্যা হলে সেদিন সব চেকের ক্ষেত্রেই সমস্যা হতো, নির্দিষ্ট একটি চেকে নয়। এখানে তদন্ত হওয়া দরকার”
মিজানুর রহমান আরও বলেন, অন্য ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স ছিল কি না, তা বনানী শাখার জানার সুযোগ ছিল না। শাখা নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের পক্ষে কাজ করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাচ (BACH) ব্যবস্থার মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করা হয়েছে।
বিষয়টি মীমাংসার জন্য আর্বিট্রেশন রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর এ এন এম মইনুল কবীর বলেন, যেহুতু বিষয়টি সমাধানের জন্য আমার দপ্তরে রয়েছে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করবো না। তবে আমাদের সিস্টেমসের কোন ত্রুটি নয়, মানবিক ত্রুটি এটুকু বলতে পারি।

 

বক্তব্য পাওয়া যায়নি এম এ আউয়াল ও খলিলুর রহমানের
পূর্বাচল হেভেলি সিটি লিমিটেড-এর-এর মালিক এবং রূপালী ব্যাংকের গ্রাহক এম এ আউয়ালের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হয়। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এম/আই

Link copied!