শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬

কারাবন্দিদের চিকিৎসা মৌলিক অধিকার

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৮:০১ এএম

কারাবন্দিদের চিকিৎসা মৌলিক অধিকার

কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীদের মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান, তাতে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর ৯ মাসে মোট ১ হাজার ২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যার ৩০০ জনই মারা গেছেন কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে। এ ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেকে মারা যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই বন্দীদের বয়স বেশি নয়, অর্থাৎ অকালমৃত্যু হচ্ছে তাঁদের। এসব তথ্য শুধু উদ্বেগজনক নয়; কারাগারে থাকা বন্দীদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্র ও সরকারের যে দায়িত্ব ও অঙ্গীকার, তার গুরুতর লঙ্ঘনও।

২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বন্দীদের প্রতি আচরণের জন্য ন্যূনতম মানদণ্ডবিষয়ক রেজোল্যুশন গ্রহণ করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, বন্দীকে অমানবিক পরিবেশে রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কোনোভাবেই শাস্তির অংশ হতে পারে না। বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, যথাযথভাবে তাঁদের বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তর কাগজে–কলমে এটিকে মিশন হিসেবে নিলেও বাস্তবতা উল্টো চিত্রকেই সামনে আনছে। দেশের ৭৫টি কারাগারে যেখানে বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন, সেখানে বর্তমানে বন্দীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার। এর অর্থ ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বন্দী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ রকম গাদাগাদি করে বন্দীদের রাখার অর্থই হলো তাঁদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।

কারাগারে সাধারণ বন্দীদের খাবারের জন্য দৈনিক মাথাপিছু বরাদ্দ ১০৮ টাকা। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই টাকায় কীভাবে একজন বন্দীর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত খাবার মিলিয়ে বন্দীদের অসুস্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কারাগারে চিকিৎসাব্যবস্থার যে চিত্র পাওয়া গেছে, সেটাকে চিকিৎসাসেবার ঘাটতি না বলে চিকিৎসার সুযোগহীনতা বলাটাই যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। কেননা, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত স্থায়ী পদ যেখানে ১৪৮টি, সেখানে মাত্র ২ জন স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন। এই বাস্তবতায় ১ লাখ ৬ হাজার বন্দীর চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রেষণে আসা চিকিৎসকেরা।

অস্থায়ী ভিত্তিতে আসা চিকিৎসকেরা বন্দীদের দিনে মাত্র দুই-তিন ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেন। আবার বন্দীর বিপরীতে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকের সংখ্যাও অনেক কম। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ১৩ হাজার বন্দীর জন্য যেখানে ৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে মাত্র ২ জন চিকিৎসক রয়েছেন। ফলে দিনে ৩০০-৪০০ রোগীকে তাঁদের চিকিৎসা দিতে হয়। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে জ্বর, পেটের পীড়া ও চর্মরোগের মতো সাধারণ কিছু রোগের বাইরে বন্দীদের চিকিৎসা দেওয়া কতটা সম্ভব, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। অনেক বন্দীর হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের অসুখের মতো জটিল রোগ রয়েছে। তাঁদের নিয়মিত পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্সও নেই।

হাসপাতালে নেওয়ার পথে এই মৃত্যু নিয়ে খোদ কারা অধিদপ্তর উদ্বিগ্ন। জেল সুপারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীদের মৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নামমাত্র চিকিৎসাসেবা দিয়ে এই উদ্বেগজনক মৃত্যু কি ঠেকানো যাবে। বন্দীদের এমন অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কি রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে?

Link copied!