ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী দিল্লিসহ গোটা ভারত। গতকাল শনিবার সকাল থেকে দিনভর শহরজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ বিরোধী দলের একাধিক শীর্ষ নেতা রয়েছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তবে দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়ায় সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। বিক্ষোভকারীদের সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিতে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি ও আটক অভিযান চালানো হয়। এর ফলে মধ্য দিল্লির একাধিক সড়কে যানজট সৃষ্টি হয় এবং স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
বিমানবন্দর থেকেই আটক সিজেপির নেতারা
শনিবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পুলিশ। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাঁদের বিমান থেকেই আটক করা হয়, যাতে তাঁরা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে না পারেন।
আটক হওয়ার আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে অভিজিৎ দীপকেকে বলতে শোনা যায়, তাঁরা বিক্ষোভে অংশ নিতে এসেছেন এবং পুলিশ চাইলে তাঁদের আটক করতে পারে। অন্যদিকে, সিজেপির দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলনের নেতৃত্বকে শুরুতেই নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। দলটি আটক নেতাদের অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।
এ ছাড়া সিজেপির আইনি বিভাগের প্রধান রত্না সিং এবং দলটির মুখপাত্র ও নীতিবিষয়ক প্রধান মেহের পারসিচাকেও আটক করা হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। জনপ্রিয় ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধ্রুব রাঠিকেও গুরুগ্রামে তাঁর বাসভবন থেকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
মমতা, কেজরিওয়াল ও পিনারাই বিজয়ন আটক
বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের অভিযানে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও আটক হন। দুপুরে আম আদমি পার্টির (আপ) জাতীয় আহ্বায়ক ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় আটক করা হয়। দিল্লি আপের প্রধান সৌরভ ভরদ্বাজকেও আটক করেছে পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এদিন পুলিশের হাতে আটক হন। এর আগে তিনি দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় একটি বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। পরে তাঁকে ও তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেন রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও যন্তর মন্তর রোডে কেরালা হাউসের কাছে আটক করা হয়। একই ঘটনায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, বাম নেত্রী বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন, পি কে শ্রীমতীসহ আরও কয়েকজন বামপন্থী নেতাকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
সিপিআই(এম) নেতা ও রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাস অভিযোগ করেন, তাঁদের কয়েকজনকে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানোর পর ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় রাখার পর আবার অন্যত্র নেওয়া হয়। তবে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁদের স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যন্তর মন্তরে প্রবেশে বাধা, বিকল্প স্থানে বিক্ষোভ
বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্র যন্তর মন্তরে শনিবার সকাল থেকেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রবেশপথে ব্যারিকেড বসিয়ে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা যাতে সেখানে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়।
যন্তর মন্তরে যেতে না পেরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ দিল্লি হাট ও সাফদারজং ফ্লাইওভারের আশপাশে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভানেত্রী নেহা বোরাসহ কয়েকজনকে দিল্লি হাটের দিকে যাওয়ার পথে আটক করা হয়।
আইসার পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সাফদারজং ফ্লাইওভারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটির বক্তব্য, কয়েকজনকে আটক করে আন্দোলন থামানো যাবে না। সিজেপির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, শীর্ষ নেতারা আটক হলেও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নেওয়া কয়েক শ বিক্ষোভকারী সকালে যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয় এবং লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, সেখানে প্রায় ৬০০ জন জমায়েত হয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সাংবাদিক ও আইনজীবীদের আটকের অভিযোগ
বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদেরও আটকের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রা করার সময় কয়েকজন আইনজীবীকে আটক করে পুলিশ।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করেছে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা আইনজীবীদের, বিশেষ করে নারী আইনজীবীদের আটক করার পাশাপাশি তাঁদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। সংগঠনটি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। আটক আইনজীবীদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়া এবং আটকের বৈধ ভিত্তি না থাকলে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
এদিকে, পুলিশের অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে তল্লাশির কারণে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
দিল্লির বাইরে মুম্বাই ও চণ্ডীগড়েও বিক্ষোভ
সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে দিল্লির বাইরেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মুম্বাইয়ের অগাস্ট ক্রান্তি ময়দানে বিক্ষোভের প্রস্তুতিকালে নাগরিক সংগঠনের নেতা তুষার গান্ধী ও তাঁর সহযোগীদের আটক করার খবর পাওয়া যায়। পরে একই স্থানে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে অভিনেতা ইমরান খানসহ অন্তত ৪০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, ওই সমাবেশের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বানুমতি নেওয়া হয়নি। বোম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিবাদ সভার জন্য নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি ছিল না বলে দাবি পুলিশের।
অন্যদিকে, চণ্ডীগড়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে আম আদমি পার্টির নেতা মণীশ সিসোদিয়াকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও আটকের ঘটনা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির প্রভাব রয়েছেঃ বিজেপি সভাপতি
দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় মোদি সরকারের সমালোচনা করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, পুলিশ মোতায়েন ও গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধীদের আন্দোলন থামানো যাবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, যত নেতাকর্মীকেই আটক করা হোক, সংবিধান রক্ষা ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার লড়াই থেকে তাঁরা সরে যাবেন না।
তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনও দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা ভারতের জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
অন্যদিকে, বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, বিরোধী দলগুলো দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। বিজেপি নেতারা বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত। সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের স্থানান্তর, ৩ কোটি মানুষের খোঁজ না পাওয়া এবং ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যুর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, যাচাই-বাছাইয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কোনো যোগ্য ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়লে তিনি পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।
তবে বিরোধী দলগুলোর দাবি, সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পড়তে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিজেপি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক আটক, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিধিনিষেধ এবং বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনায় বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল।
