সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

জি-২০ জোটের সম্মেলন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার যুক্তরাষ্ট্রের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

জি-২০ জোটের সম্মেলন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে ২০২৬ সালের জি-২০ সম্মেলন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। তবে একই সময়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মতপার্থক্য এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিরোধ বাড়ায় বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জি-২০ এর কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি এক মতামত নিবন্ধে এ উদ্বেগ তুলে ধরেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলএসই আইডিয়াসের সহযোগী অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় জি-২০ এর ভূমিকা

১৯৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের পর ১৯৯৯ সালে জি-২০ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্র। বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠে এই ফোরাম।

২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় জি২০ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ২০০৯ সালের এপ্রিলে লন্ডন সম্মেলনে চাহিদা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমন্বিত সহায়তা প্যাকেজে সম্মত হন বিশ্বনেতারা। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের কূটনৈতিক উদ্যোগ ওই সমঝোতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সেই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল যে বড় অর্থনীতিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাত কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভাজন সেই সহযোগিতাকে কঠিন করে তুলছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘিরে নতুন বিরোধ

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের জি-২০ আয়োজন নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয় দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণ। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ কার্যক্রম বর্জন করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হত্যা ও জমি কেড়ে নেওয়ার শিকার হিসেবে তুলে ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অভিযোগ করেছিলেন, তা এই বিরোধের পটভূমির অংশ ছিল। ওই অভিযোগ ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

এবার যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে জি-২০ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে পোল্যান্ডকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইউরোপের কয়েকটি দেশের আপত্তির কারণ হয়েছে। ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগের বিষয় হলো, দক্ষিণ আফ্রিকা জি-২০ এর পূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে আয়োজনের বাইরে রাখা বহুপক্ষীয় ফোরামের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

এই বিরোধ শুধু দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আন্তর্জাতিক ফোরামে সদস্যদের সমান অংশগ্রহণ, আয়োজক দেশের দায়িত্ব এবং বৈশ্বিক আলোচনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করছে।

‘নতুন জি-২০’ এজেন্ডা নিয়ে মতপার্থক্য

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বর্ণিত ‘নতুন জি-২০’ এজেন্ডা নিয়েও বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ রয়েছে। এই এজেন্ডায় জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, অভিবাসন, নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জ্বালানি রূপান্তরের মতো বিষয়গুলোকে সম্মেলনের আলোচনায় তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অগ্রাধিকার ডিসেম্বরের যৌথ ঘোষণার খসড়াতেও প্রভাব ফেলছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন এবং জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং অন্য সদস্য দেশগুলোর অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং কোন বিষয়গুলো যৌথ ঘোষণায় স্থান পাবে, তা নিয়ে দর-কষাকষি এবারের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ার অভিযোগ ও অংশগ্রহণের প্রশ্ন

জি-২০ এর আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে রাশিয়াও প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছে। জি-২০ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত-অ্যাট-লার্জ মারাত বেরদিয়েভের অভিযোগ, ভিসা প্রত্যাখ্যান ও স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে রাশিয়ার প্রতিনিধিরা মার্কিন আয়োজিত আর্থিক বৈঠকগুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে পারেননি।

এসব বিরোধের মধ্যে এপ্রিলে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজিত জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়নি।

রাশিয়ার অভিযোগগুলো মস্কোর নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। তবে অভিযোগের সত্যতা ও পরিসর নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বৈঠকে অংশগ্রহণের সুযোগ, প্রতিনিধিদের স্বীকৃতি এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জি-২০ এর মতো ফোরামের কার্যকারিতা শুধু বৈঠক আয়োজনের ওপর নির্ভর করে না; সদস্যদের মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময় এবং গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভূরাজনৈতিক বিভাজনে দুর্বল হচ্ছে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা

কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভাজন আরো স্পষ্ট হয়েছে। চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা, রাশিয়াকে ঘিরে বিরোধ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকে কূটনৈতিক সংঘাত জি-২০ এর কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।

এ অবস্থায় এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। জি-২০ এবং জি-৭ এর মতো বহুপক্ষীয় ফোরাম ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র আগামী বছর জি-৭ এরও আয়োজন করবে। ফলে চলতি বছরের জি-২০তে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আলোচনার পদ্ধতি এবং যৌথ অবস্থান তৈরির অভিজ্ঞতা পরবর্তী আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

বৈশ্বিক সংকটে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

বর্তমান বিভাজনের মধ্যেও বিশ্বনেতাদের বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। মহামারি, আর্থিক বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো সমস্যাগুলো কোনো একক দেশের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

এ ধরনের সংকটে তথ্য বিনিময়, অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয়, যৌথ সিদ্ধান্ত এবং পারস্পরিক আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জি-২০ এর মতো ফোরাম এসব ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদিও সদস্যদের মতপার্থক্যের কারণে সব সময় অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা ও বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সহযোগিতার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে দেওয়া উচিত নয়। কারণ বৈশ্বিক সংকট যখন একাধিক দেশকে একই সঙ্গে প্রভাবিত করে, তখন সমন্বিত উদ্যোগ সংকটের অভিঘাত কমাতে সহায়ক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের জি-২০ সভাপতিত্ব তাই একদিকে ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ, অন্যদিকে বহুপক্ষীয় কূটনীতির কার্যকারিতা ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সদস্য দেশগুলোর অংশগ্রহণ, মতপার্থক্যের গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই ফোরাম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এম/আই

Link copied!