বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

বিক্ষোভে অচল ফ্রান্স, প্রচণ্ড চাপে ম্যাক্রো সরকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

বিক্ষোভে অচল ফ্রান্স, প্রচণ্ড চাপে ম্যাক্রো সরকার

বিক্ষোভ দমনে কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়িয়েছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে জনসমাগমস্থলে পুলিশের উপস্থিতিও বাড়িয়েছে। সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন ভবনে আগুন দেওয়া ও হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর সরকার। তবে গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করা সমস্যাগুলোর সমাধান করা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় থেকে স্বস্তি দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও সংসদে রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বাজেট পাশ করাও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারফিউ জোরদার, মাঠে অতিরিক্ত পুলিশ

আগামী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ সামনে রেখে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের তীব্রতা যথাযথভাবে আঁচ করতে পারেনি। শনিবারের বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সহিংসতার মধ্যে মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের একটি ঐতিহাসিক টাউন হলও পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। লিওঁসহ অন্যান্য শহরেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার রাতে প্যারিস ও লিওঁতে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আরও বাড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং সহিংসতায় জড়িতদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করেন। তিনি বলেন, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মপরিবেশের দাবিতে যারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন, তাদের কথা শুনবে সরকার। তবে সহিংসতায় জড়িতদের শাস্তি দেওয়া হবে।

আর্থিক সংকটে ফ্রান্স সরকার

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপকণ্ঠে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষকসংকটের সমাধান চেয়ে তারা আন্দোলনে নামেন। পরে এতে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা যুক্ত হন। একপর্যায়ে আন্দোলনটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।

বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। গত ৮ অক্টোবর দেশটির জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকটে থাকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তিন হাজারের বেশি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পাশাপাশি আরও কয়েক শ শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।

তবে আর্থিক চাপ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে বড় পরিসরে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছায়। যা দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশের সমান।

চলতি বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালে তা কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে আগামী বছর শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় ১২ বিলিয়ন ইউরো বেড়ে ৯১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। এতে জনসেবামূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, ফ্রান্সের পার্লামেন্টে ম্যাক্রোর মিত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। চলতি বছরের বাজেট পাশ করতেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় সরকারকে। চূড়ান্ত ভোট ছাড়াই বিশেষ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে বাজেট কার্যকর করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এ নিয়ে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখেও পড়তে হয় মন্ত্রিসভাকে। তবে দুটি অনাস্থা প্রস্তাবই টিকে যায়।

এম/আই

Link copied!