খাদ্যাভ্যাস ও ক্যানসার চিকিৎসার মধ্যে এক অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খাবার সাধারণত অস্বাস্থ্যকর বা ওজন বাড়ানোর জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়, সেসব খাবারের কিছু ইঁদুরের শরীরে ক্যানসারের একটি প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়িয়েছে।
এই আবিষ্কার থেকে গবেষকেরা ধারণা করছেন, ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্য শুধু অন্ত্রে কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং এসব ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকতে ও বেড়ে উঠতে কী ধরনের খাবার পাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং রোজালিন্ড অ্যান্ড মরিস গুডম্যান ক্যানসার ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক ড্যানিয়েলা কুয়েল বলেন, ‘আমাদের পরিপাকতন্ত্রে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া এবং আমরা যে খাবার খাই, তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সঠিক সমন্বয় থাকলেও সেগুলোকে পুষ্টি জোগাতে আমরা কী ধরনের খাবার খাচ্ছি, তার ওপর নির্ভর করতে পারে চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার বিষয়টি।’
কুয়েল ও তার সহকর্মীরা গবেষণাটিতে পরীক্ষা করেছেন, খাদ্যাভ্যাস কীভাবে ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর নামের ওষুধের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। এসব ওষুধ ক্যানসার ইমিউনোথেরাপিতে বহুল ব্যবহৃত হয়। এগুলো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লোগান ওয়ালশ এবং সিআর-সিএইচইউএমের গবেষক বার্ট্রান্ড রুতি ও অ্যারিয়েল এলক্রিফও যুক্ত ছিলেন। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
অস্বাস্থ্যকর খাবারে কেন মিলল ইতিবাচক ফল?
গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ওজন বাড়ায় এমন কিছু খাদ্যাভ্যাস ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। এই ফলাফল পুষ্টি ও ক্যানসার চিকিৎসার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ড্যানিয়েলা কুয়েল বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল বিস্ময়কর। কারণ, এতে দেখা গেছে, স্থূলতা বাড়াতে পারে—এমন কিছু খাদ্যাভ্যাসেরও ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ক্যানসার চিকিৎসায় খাদ্যের ভূমিকা শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও ব্যায়াম করার পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি আরও জটিল।’
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই ফলাফলের অর্থ এই নয় যে ক্যানসার রোগীদের ওজন বাড়ায় এমন খাবার খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত ওজনের কারণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তা ছাড়া ইঁদুরের ওপর পাওয়া এই ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের মূল লক্ষ্য হলো, বিভিন্ন ধরনের খাবার অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বোঝা।
স্থূলতা নিয়ে ক্যানসার গবেষণায় নতুন ব্যাখ্যা
গবেষণাটি শুরু হয়েছিল ক্যানসারবিষয়ক একটি দীর্ঘদিনের রহস্যের সূত্র ধরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি অবেসিটি প্যারাডক্স বা স্থূলতার আপাতবিরোধী প্রভাব নামে পরিচিত।
সাধারণভাবে স্থূলতা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এবং ক্যানসারে মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ায়। কিন্তু কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ক্যানসার রোগীর বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) তুলনামূলক বেশি, তারা কখনো কখনো ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেন।
এই রহস্যের কারণ খুঁজতে গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর ১২ ধরনের খাদ্যাভ্যাস পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, স্থূলতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু খাদ্যাভ্যাস ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা বাড়িয়েছে। এমনকি অল্প সময় ধরে এসব খাবার খাওয়ানোর পরও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্যানসার চিকিৎসায় ভালো সাড়া পাওয়ার পেছনে শুধু অতিরিক্ত শারীরিক ওজন দায়ী নয়। বরং খাদ্যাভ্যাস ও অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সম্মিলিত প্রভাব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে, যা চিকিৎসার কার্যকারিতায় ভূমিকা রাখে।
এই পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে স্থূলতার স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াই ইমিউনোথেরাপির ইতিবাচক প্রভাব পাওয়ার নতুন উপায় বের করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: সাইন্স ডেইলি
