বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় আসে একটি সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং তথ্যের সরকারি প্ল্যাটফর্ম স্পেস ট্র্যাকার জানিয়েছিল, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)-এর দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ।
ধ্বংসাবশেষটি ছিল ভারতের পুরোনো ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের অংশ। সেটি বিএস-১-এর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করার কথা ছিল। ফলে তৈরি হয়েছিল সংঘর্ষের আশঙ্কা। সংঘর্ষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হতে পারত বাংলাদেশের একমাত্র যোগাযোগ স্যাটেলাইট।
বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের হাতে সময়ও ছিল খুব কম। পরবর্তী চার দিন গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনে চলতে থাকে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১-এর অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন এনে বিপদ এড়ানো হয়।
রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএলের কার্যালয়ে বুধবার সকালে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ওই কয়েকটি দিন খুবই উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। হাতে সময় কম ছিল। আবার বিএস-১-কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিপদ হয়নি। স্যাটেলাইটটি রক্ষা করা গেছে।’
মহাকাশে শুধু সচল স্যাটেলাইটই ঘুরে বেড়ায় না। বিভিন্ন সময়ে উৎক্ষেপণ করা স্যাটেলাইটের অকেজো অংশ, নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশসহ নানা ধরনের বস্তু পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এসবকে বলা হয় স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশের বর্জ্য।
মহাকাশে কোনো স্যাটেলাইটের সঙ্গে এসব বর্জ্যের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে বিভিন্ন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। বিএসসিএলও নিয়মিত এ ধরনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে।
৯ আগস্টের সতর্কবার্তা থেকে বিএসসিএল জানতে পারে, বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের।
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) তথ্য অনুযায়ী, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই এতে সমস্যা দেখা দেয়। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্যাটেলাইটটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
মহাকাশে স্যাটেলাইটের সঙ্গে ধ্বংসাবশেষ বা অন্য কোনো বস্তুর সংঘর্ষের ঝুঁকি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার উদাহরণ রয়েছে। ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার অকেজো স্যাটেলাইট কসমস-২২৫১ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সচল যোগাযোগ স্যাটেলাইট ইরিডিয়াম-৩৩ মহাকাশে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়।
বিএস-১-এর জন্য এ ধরনের ঝুঁকি এবারই প্রথম তৈরি হয়নি। বিএসসিএল সূত্র বলছে, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও দুবার স্যাটেলাইটটির সঙ্গে মহাকাশের অন্য বস্তুর সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
২০২১ সালে ঝুঁকির কারণ ছিল রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। আর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১-এর খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় বিএস-১।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটটি তৈরিতে ও উৎক্ষেপণে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হওয়া বিশ্বের ৫৭তম দেশ হয়।
২০১৮ সালে ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস বিএস-১ তৈরি করে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করত প্রতিষ্ঠানটি।
সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে বিএস-১-এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় বিএসসিএল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনটি এখন স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের প্রধান কেন্দ্র।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন। ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইটের ওপর নজর রাখা হয়। কর্মীরা পালা করে দায়িত্ব পালন করেন।
৯ আগস্ট সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয়। বিএসসিএলের কর্মকর্তারা মহাকাশের বস্তুর গতিপথ ও অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।
ইমাদুর রহমান বলেন, ‘ধ্বংসাবশেষটি এড়িয়ে বিএস-১-কে সরানো হবে কি না, সরানো হলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো যাবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছিল। স্যাটেলাইটকে নতুন অবস্থানে নিলে সেখানেও কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, সেটিও হিসাব করতে হচ্ছিল।’
শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১-কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রকৌশলীরা। এরপর ধ্বংসাবশেষটি অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার হওয়ার পর স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষটি একপর্যায়ে বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।
ইমাদুর রহমান বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের জন্য এটি একটি সাফল্য।
বাংলাদেশের বিএস-১ স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং বাকি ২০টি দেশের বাইরের গ্রাহকদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এসব ট্রান্সপন্ডার বিদেশে ইজারা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়।
বিএসসিএল জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল বিএস-১-এর সেবা ব্যবহার করছে।
