ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের চামড়া শিল্পের অধঃপতন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, সরকার দেশের চামড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিসিক নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন ও এ খাতের সমস্যা সমাধানেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সময় নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আর সময় নষ্ট করতে চান না।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিসিক আয়োজিত জব অ্যান্ড ক্যারিয়ার ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মেলায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন তরুণকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।
বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ একসময় কৃষিনির্ভর দেশ ছিল। ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছিল কুটির শিল্প। ১৯৫৭ সালে ইপসিক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি বিসিক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে সারা দেশে বিসিকের ৮৪টি শিল্পনগরী রয়েছে। এসব শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির কাজও করছে বিসিক।
তিনি আরও বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশ এবং পুরুষ উদ্যোক্তাদের ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে বিসিক। উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির লক্ষ্যে প্রতি মাসে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে বড় পরিসরে একটি মেলার আয়োজন করা হবে।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে বেনজীর আহমেদ বলেন, চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিদাতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যেই জব ফেয়ারের আয়োজন। দেশের শিল্প ও ব্যবসায় খাতে কী পরিমাণ মূল্য সংযোজন করা যাচ্ছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশের অন্যতম সুবিধা ছিল স্বল্পমূল্যের শ্রমিক ও গ্যাসের সহজলভ্যতা। বর্তমানে গ্যাসের সংকট রয়েছে। তাই দেশের নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। দেশীয় কাঁচামালভিত্তিক শিল্পের বিকাশে বিসিক কাজ করছে। ঢাকার চামড়া, প্লাস্টিক ও মুদ্রণ শিল্পের কারখানাগুলো বিসিকের শিল্পপার্কে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
চট্টগ্রাম শহরকে আরও বাসযোগ্য ও যানজটমুক্ত করতে নগরের বিভিন্ন কারখানা পরিকল্পিত শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দেশে বেকারত্ব দূর করতে বিসিকের জব ফেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। সেই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় নান্দনিক হিসেবে পরিচিত শহরটি জলাবদ্ধতা, যানজট ও অব্যবস্থাপনার কারণে নানা সংকটে পড়েছে। আগ্রাবাদ এলাকায় ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের বড় অংশও হকারদের দখলে চলে গেছে। সড়কের দুই পাশে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে এবং যানজটের কারণে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
বেলায়েত হোসেন বলেন, এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে অনিয়মের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নগরের উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
দি চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধান করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিসিকের প্রশিক্ষণ ও মেলা আয়োজনের মতো কার্যক্রমে চিটাগং চেম্বারকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিসিক পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, বিসিক একটি সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান। দেশের শিল্পায়ন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎমিলা ফরিদ বলেন, জব ফেয়ার শিক্ষা ও ব্যবসায় খাতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করছে। এর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগদাতাদের চাহিদা এবং চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারছেন। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। মেলা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও মতামত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিনিময় করা হলে পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করা এবং দক্ষতার ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।
বিসিক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক ও অনুষ্ঠানের সভাপতি খালেদ মাহমুদ বলেন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা বিসিকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ জব ফেয়ারের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা সফল উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের গল্প জানতে পারবেন। এতে তাঁদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে নিজেরাই অন্যদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এসএম আলকাদেরী।
