বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

রূপসায় ১২ হত্যাকাণ্ড, পুলিশের ‘ডাবল ডোজ’ অভিযান

খুলনা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

রূপসায় ১২ হত্যাকাণ্ড, পুলিশের ‘ডাবল ডোজ’ অভিযান

খুলনা পুলিশ


খুলনা জেলায় চলতি বছরে ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হলেও ১০টি এখনও অনুদ্ঘাটিত। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি রূপসায় জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ দুই টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এমন বাস্তবতায় এবার ডাবল ডোজ অভিযানে নামার ঘোষণা দিয়েছে জেলা পুলিশ। রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এই চার থানাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ধরে ২৪ ঘণ্টা অভিযান, চেকপোস্ট ও ব্লক রেইড চালানো হবে। পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চান। অপরাধীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে এলাকায় কোনো কাজ করা যাবে না।
বুধবার বিকেলে খুলনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকেই হত্যাকাণ্ডের একটি অংশ ঘটছে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও হত্যাকাণ্ড বাড়াচ্ছে। এ কারণে বিশেষ অভিযানে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলি করে টার্গেট কিলিং হয়েছে ৯টি। মাদককে কেন্দ্র করে হত্যা তিনটি, সামাজিক দ্বন্দ্ব বা মারামারিতে ১৩টি, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ে দুটি, অজ্ঞাত কারণে দুটি, শ্বাসরোধে দুটি নবজাতক হত্যা এবং পারিবারিক বা পরকীয়াজনিত কারণে চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলোর পেছনেও মূলত মাদককেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে বলে পুলিশের বিশ্লেষণ।
রূপসাকে অপরাধের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনে ভৌগোলিক ও জনবসতিগত কারণও দেখছে পুলিশ। শহরের কাছাকাছি হলেও রূপসা নদী দিয়ে খুলনা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চল। অপরাধ করে নদীপথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘনবসতি, অসংখ্য সরু গলি ও শাখা-প্রশাখা সড়ক অপরাধীদের আত্মগোপন ও দ্রুত স্থান পরিবর্তনে সহায়তা করছে।
গতকাল সন্ধ্যা থেকে চার থানায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নড়াইল ও যশোরসহ অন্য জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ২৫০ পিস ইয়াবা ও এক কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের বড় একটি অংশ অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের চলাচলের তথ্য অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া কয়েকজন ওয়াচারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে এতদিনের অভিযানে অস্ত্র উদ্ধারের সাফল্য না থাকায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুপার নিজেই স্বীকার করেছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত অভিযান চললেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষায়, আগের অভিযান যথেষ্ট তীব্র ছিল না। এবার কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাছে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে, নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করার পরও রূপসায় এক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল। পরিবারের অভিযোগ, নিরাপত্তা চাওয়ার তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকেই সন্ত্রাসীদের কাছে ফাঁস হয়েছিল। পুলিশ সুপার বিষয়টি অস্বীকার না করে বলেন, এ ঘটনায় সেনসিটিভিটি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
শুধু পুলিশি অভিযান নয়, ভাড়াটিয়া শনাক্তকরণ ও সিসিটিভি ব্যবস্থার ঘাটতিও উঠে এসেছে সংবাদ সম্মেলনে। পুলিশের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়েছে। ফলে পাশের বাড়িতে কে থাকছে, সে তথ্যও অনেক সময় পুলিশ পাচ্ছে না। হটস্পটগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ।
অভিযানের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে চেকপোস্ট কয়েক দিন জোরালো থাকার পর ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সাংবাদিকরা। পুলিশ সুপার জানান, এবার চেকিং ও দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি ২৪/৭ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মাদক স্পট, সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য আস্তানা ও চাঁদাবাজদের এলাকায় অভিযান চলবে।
পুলিশ সুপার বলেন, আগের একক প্রচেষ্টায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় এবার কেএমপি, জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাও এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক কোনো অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

এম/এ

Link copied!