বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
দায় নিতে নারাজ সংসদ সদস্য

খুলনায় যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, বিব্রত স্থানীয় বিএনপি

খুলনা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

খুলনায় যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, বিব্রত স্থানীয় বিএনপি

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ১ নম্বর জলমা ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক, পাড়া-মহল্লা ও বাজার এলাকায় যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সীর পোস্টার শোভা পাচ্ছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ থেকেই এসব পোস্টার লাগানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়ানোর এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি জমি দখল, বিধবার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, চাঁদাবাজি, সরকারি খাল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও যুবদলের কয়েকজন নেতার অভিযোগ, গত এক বছরে বাহাদুর মুন্সীর প্রভাব ও সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব পদে এসেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন অপকর্মে জড়াচ্ছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাহাদুর মুন্সী।
অভিযোগগুলোর কারণে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির কয়েকজন নেতা। তাঁদের আশঙ্কা, ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব পড়তে পারে দলের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর।
বিধবার জমি দখলের চেষ্টা, ভাঙচুর ও হত্যার হুমকির অভিযোগ:
খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল এলাকার বাসিন্দা বিধবা নাছিমা হাসান অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী ইমাম হাসান বাচ্চু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামী জীবিত থাকাকালে ২০১৫ সালের ৮ মার্চ বটিয়াঘাটা উপজেলার রাঙ্গেমারী গ্রামে ১৪ শতক জমি কেনেন তিনি। জমিটির দাগ নম্বর ২১৬৩। সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি আরসিসি ঢালাই দিয়ে দোকানঘরও তৈরি করা হয়।
নাছিমার অভিযোগ, ২০২৫ সালের একটি দলিল দেখিয়ে বাহাদুর মুন্সী জমিটির একাংশ দখলের চেষ্টা করছেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা পুলিশ সুপারকে জানানোর পর বাহাদুর ক্ষুব্ধ হন। এর জেরে এক রোববার সকালে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে লোকজনসহ নির্মাণাধীন দোকানঘরটি হ্যামার দিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
এ ঘটনায় নাছিমা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এমপি মামলা নম্বর ৫০২/২৬ দায়ের করেন। আদালত শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিলেও তা অমান্য করে গত ১৩ অক্টোবর তাঁকে ও তাঁর ছেলেদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাছিমা জানান, ওই ঘটনায় একই দিন অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেছেন। তবে মামলা দায়েরের পরও তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ভাড়া নেওয়া দোকান নিজের দাবি, দখলের অভিযোগ:
বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা বিভাস গোলদার অভিযোগ করেন, চক্রাখালী বাজারে তাঁর পৈতৃক সম্পত্তিতে নির্মিত দোকানঘর ভাড়া দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাহাদুর মুন্সী ব্যক্তিগত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য সেখানকার একটি দোকান ভাড়া নেন।
বিভাসের দাবি, কয়েক মাস পর বাহাদুর মুন্সী দোকানগুলো নিজের বলে দাবি করেন এবং সেগুলোর মালিকানার দলিল থাকার কথা জানান। এভাবেই তাঁর দোকানঘর দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিভাসের।
তিনি বলেন, “আমি হিন্দু মানুষ, কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না।” এ কারণে তিনি মামলা-মোকদ্দমায় জড়াননি বলে জানান।
এ ছাড়া চক্রাখালী বাজারে আকরাম নামের এক ব্যক্তির সাতটি দোকান দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে। বটিয়াঘাটার তেতুলতলা এলাকার দরিদ্র মরিয়মের ২৫ শতক জমি দখলের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
ছয়ঘরিয়া এলাকায় একটি স্কুলের পাশে দোকানঘর দখল করে সেখানে বাহাদুর মুন্সীর ভাই বাদশা ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জমি দখল করে ভ্যানের গ্যারেজ, দোকানঘর ও প্লট তৈরি করার অভিযোগও উঠেছে বাহাদুরের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের বক্তব্য ও জমির দলিলপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
চাঁদাবাজি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ:
স্থানীয় যুবদলের মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, বটিয়াঘাটা বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাহাদুর মুন্সী ও তাঁর লোকজন জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেন।
তাঁদের আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পশুর নদসংলগ্ন তেতুলতলা, পুটিমারী, কাতিয়ানাংলা ও আশপাশের এলাকায় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করছেন বাহাদুর মুন্সী ও তাঁর লোকজন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি খাল দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ৮ আগস্ট রাতে বাহাদুরের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে বলে তাঁরা জানান। তবে ওই ঘটনার কারণ, হতাহতের তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে খোকন ও জাহাঙ্গীর হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা থাকার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন নেতা। তাঁদের দাবি, সম্প্রতি প্রভাব খাটিয়ে কয়েকটি মামলা প্রত্যাহার করানো হয়েছে। তবে এসব মামলার বর্তমান অবস্থা, আসামিদের ভূমিকা এবং মামলা প্রত্যাহারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত ও পুলিশের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
বাহাদুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বাদল নামের এক ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। একসময় ভ্যান চালাতেন বলে পরিচিত ওই ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তবে তাঁর সম্পদের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুবদলের তৃণমূলে অসন্তোষ:
বটিয়াঘাটা সদর থানা যুবদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে বাহাদুর নামে কাউকে আমরা চিনতাম না। হঠাৎ করেই তিনি পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে দল বিব্রত।”
ওই নেতা আরও বলেন, খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনটি পুনরুদ্ধার করতে বিএনপিকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে হলে দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন চাঁদাবাজি বা দখলবাজিতে জড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার বাহাদুর মুন্সীর:
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাহাদুর মুন্সী বলেন, ইমাম হাসান বাচ্চুর পরিবারের জমির কাগজপত্র ঠিক আছে। সে কারণেই তিনি জমিটি কিনেছেন এবং দখল বুঝে নিয়েছেন।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং তাঁর দাবি অনুযায়ী, সেখানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি বলেন, “আমি সঠিকভাবে কাজ করেছি। কোনো আইন ভঙ্গ করিনি।”
চাঁদাবাজি, বালুমহাল দখল ও অন্যান্য অভিযোগও অস্বীকার করেন বাহাদুর। তাঁর দাবি, দলের সুবিধাবঞ্চিত একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অপকর্মের দায় দল নেবে না: আমীর এজাজ খান, এমপি
বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ জমি দখল, চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধে জড়ালে তার দায় দল নেবে না।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় তাঁর একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। কোনো ভূমিদস্যু বা দুষ্কৃতকারীর কারণে সেই ভাবমূর্তি নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। দখলদারদের অবস্থান তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না: পুলিশ সুপার
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, বটিয়াঘাটাসহ জেলার চারটি উপজেলায় বিশেষ অভিযান চলছে। অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
জমি দখলসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ পুলিশের কাছে আসে। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি:
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দখল, চাঁদাবাজি, সরকারি খাল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুতর বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমির মালিকানা, আদালতের নির্দেশনা, দোকানঘর ভাঙচুর, হুমকির অভিযোগ এবং বালু উত্তোলনের বৈধতা যাচাই করে প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, বাহাদুর মুন্সী সব অভিযোগ অস্বীকার করে জমির মালিকানা ও দখলের পক্ষে বৈধ কাগজপত্র থাকার দাবি করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে জমির দলিল, আদালতের আদেশ, সংশ্লিষ্ট মামলার নথি এবং প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জে/এইচ

Link copied!