বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে একটি সুসজ্জিত গাড়ি প্রস্তুত। বিদ্যালয় ভবন থেকে গাড়ি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কিছুক্ষণ পর শিক্ষক বের হয়ে এলেন এবং উঠে বসলেন গাড়িতে। পাপড়ি ছিটিয়ে করতালি দিয়ে স্বাগত জানালো সবাই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে পৌঁছে দিলো বাড়িতে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য ছিল এমন। প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিন ৩৪ বছর ৬ মাস দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে গেছেন। তাই প্রিয় শিক্ষকের বিদায় জানাতে বিদ্যালয় পরিবার এসব আয়োজন করে। এ আয়োজন দেখে প্রধান শিক্ষক আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
বাঁশের ঘরের বিদ্যালয় থেকে পাকা ভবন—দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী তিনি। একই বিদ্যালয়ে টানা ৩৪ বছর ৬ মাস শিক্ষকতা শেষে অবসরে গেলেন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিন। দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে ফুলেল ভালোবাসা ও সম্মাননায় তাকে রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে বিদ্যালয় পরিবার।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সেনবাগ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়াহিদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ৩ নং ডুমুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জসিম উদ্দিন, সদস্য সচিব মো. ওমর ফারুক এবং গাজীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মাস্টার মীর হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি আবদুল বাতেন ভূঁইয়া। সঞ্চালনা করেন বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষক সুমন মাহমুদ।
জানা যায়. মো. গিয়াস উদ্দিন ১৯৯২ সালের ২০ এপ্রিল বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর দীর্ঘ ৩৪ বছর ৬ মাস একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিদ্যালয়ের পরিবর্তন, শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার কর্মজীবনের নানা স্মৃতি।
শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই করেননি, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনেও ভূমিকা রেখেছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে তিনি সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মো. গিয়াস উদ্দিন ১৯৬৭ সালের ১ নভেম্বর নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম মো. ইদ্রিস মিয়া এবং মা দেলবাহার বেগম। তিনি ১৯৮৪ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৬ সালে একই বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময়ে সি-ইন-এডসহ বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার শিক্ষকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া জ্ঞান, মূল্যবোধ ও আদর্শ দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চাকরির নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হওয়ায় ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, দীর্ঘ ৩৪ বছর ৬ মাস এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেছি, শাসন করেছি এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আজকের এই সম্মান ও ভালোবাসা আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। অবসরে গেলেও বিদ্যালয়, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভুলতে পারব না। সবার কাছে দোয়া চাই, যেন অবসর পরবর্তী জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারি।
বিশেষ অতিথি ডুমুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জসিম উদ্দিন জানান, একজন শিক্ষকের অবদান কখনো শুধু বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার শিক্ষা ও আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে। গিয়াস উদ্দিন স্যার দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার শিক্ষার্থীদের আলোকিত করতে কাজ করেছেন। তার মতো একজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে সম্মান জানাতে পেরে আমরা আনন্দিত।
একই ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তার শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও ভালোবাসা। দীর্ঘ কর্মজীবনে গিয়াস উদ্দিন স্যার অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তার অবসর পরবর্তী জীবনের সুস্বাস্থ্য ও সুখ-শান্তি কামনা করি।
বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষক সুমন মাহমুদ জানান, একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও তার রেখে যাওয়া শিক্ষা, আদর্শ ও অনুপ্রেরণা শিক্ষার্থীদের পথচলায় বেঁচে থাকে। বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে মো. গিয়াস উদ্দিনের দীর্ঘ পথচলাও হয়ে থাকবে স্মরণীয় অধ্যায়।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি আবদুল বাতেন ভূঁইয়া জানান, একটি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গিয়াস উদ্দিন স্যার দীর্ঘ ৩৪ বছর ৬ মাস এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন। আমরা চাই, তার অবদান বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকুক।
প্রধান অতিথি সেনবাগ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়াহিদুর রহমান জানান, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। মো. গিয়াস উদ্দিন দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। তার কর্মজীবন নতুন শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এমন সম্মানজনক বিদায় আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়।
