চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু যেন বারবার ফিরে আসা এক নির্মম বাস্তবতা। বিষাক্ত গ্যাস, অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, ভারী লোহার আঘাত কিংবা ওপর থেকে পড়ে যাওয়া—কর্মক্ষেত্রে নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত, সতর্কতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও শিল্পটির ঝুঁকি কমানোর প্রশ্নটি থেকেই যায়। এর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাস ‘লাল’ থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনার উদ্যোগ।
গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে এক দিনে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা পুরো শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জানিয়েছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও ওই ইয়ার্ডে নিরাপত্তাব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি ও অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে।
এমন একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মাত্র দেড় মাস পর, গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের একটি কমিটির সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসে। বাপার উদ্বেগ, এই পরিবর্তনের ফলে শিল্পটির ওপর পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—যে শিল্পে শ্রমিকের জীবন ও পরিবেশ দুটিই গুরুতর ঝুঁকিতে, সেখানে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও কঠোর করার পরিবর্তে পরিবেশগত বিধিব্যবস্থা শিথিল করার প্রয়োজন কেন?
শিল্পের বিকাশ, কিন্তু কার জীবনের বিনিময়ে?:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাহাজভাঙা শিল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পুরোনো জাহাজ ভেঙে পাওয়া লোহা ও অন্যান্য উপকরণ দেশের নির্মাণ, পুনর্ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, ব্যবসা পরিচালিত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে।
কিন্তু শিল্পের অর্থনৈতিক অবদান কখনোই শ্রমিকের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হতে পারে না। একটি শিল্প লাভজনক হলেই তার নিরাপত্তাঝুঁকি উপেক্ষা করার অধিকার কারও জন্মায় না। বরং যে শিল্পে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি, সেখানে নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
জাহাজভাঙার কাজে ট্যাংক, বদ্ধ কক্ষ ও বিভিন্ন অংশে জমে থাকা বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাস প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সঠিক পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী এবং প্রশিক্ষিত কর্মী ছাড়া এসব স্থানে কাজ করা মারাত্মক বিপজ্জনক। নিরাপত্তাব্যবস্থায় সামান্য অবহেলাও একসঙ্গে বহু শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
তাই ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
‘লাল’ থেকে ‘কমলা’ পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?:
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। উচ্চ ঝুঁকির শিল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসহ তুলনামূলক কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন হয়। জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘লাল’ শ্রেণি থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনার উদ্যোগ কার্যকর হলে অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্তে কী পরিবর্তন আসবে, তা স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
শিল্পমালিকদের পক্ষ থেকে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক ক্ষতির যুক্তি তুলে ধরা হয়ে থাকলে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। সরকারি অনুমোদনে অযৌক্তিক বিলম্ব থাকলে তা দূর করা উচিত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর নামে পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেওয়া সমাধান হতে পারে না।
সমস্যা যদি অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা হয়, তাহলে নির্দিষ্ট সময়সীমা, অনলাইন আবেদন, স্বচ্ছ অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তা সমাধান করা সম্ভব। এজন্য শিল্পের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক পরিবেশগত সুরক্ষা দুর্বল করার প্রয়োজন নেই।
এখানে সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের আগে কী ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে? শ্রমিকের নিরাপত্তা, বায়ু ও পানি দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আশপাশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কতটা বিবেচনা করা হয়েছে? সিদ্ধান্তের পক্ষে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত যুক্তি থাকলে তা প্রকাশ করা হোক।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্রমিক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কোথায়?:
বাপার বিবৃতি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পরিবেশমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও কয়েকজন সচিব রয়েছেন। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টি নিয়ে সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে।
যে সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে হাজারো শ্রমিক, তাঁদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশের ওপর, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্রের বাস্তব ঝুঁকি সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দূষণ ও প্রতিবেশগত ক্ষতির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে পারেন। আর স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে নীতিমালা আরও বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও জনস্বার্থসম্মত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শ্রমিকের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করবে কে?:
একজন শ্রমিকের মৃত্যু মানে শুধু একজন কর্মক্ষম মানুষের জীবন শেষ হওয়া নয়, এর সঙ্গে একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, সন্তানদের শিক্ষা অনিশ্চিত হওয়া এবং নির্ভরশীল স্বজনদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়াও জড়িত।
দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও সেই অর্থ পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পূরণ করতে পারে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে আইনগত অধিকার, আয়ের পরিমাণ, নির্ভরশীল সদস্য, চিকিৎসা ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিয়োগের নথি, বেতন, কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ, বিমা ও নিরাপত্তাসামগ্রীর তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত শ্রমিকেরাও যেন দুর্ঘটনার পর আইনগত অধিকার ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সরকারের কাছে পাঁচটি জরুরি করণীয়:
জাহাজভাঙা শিল্পকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারকে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রথমত, শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পরিবেশগত ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন ও জনপরামর্শ ছাড়া কোনো চূড়ান্ত পরিবর্তন না করে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক প্রতিনিধি, আইনজ্ঞ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা যাচাই কার্যকর রাখতে হবে। অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট সময়সীমা, অনলাইন ট্র্যাকিং এবং স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ চালু করা যেতে পারে। তবে দ্রুত অনুমোদনের নামে ঝুঁকি মূল্যায়ন বাদ দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, প্রতিটি ইয়ার্ডের নিরাপত্তা নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। গ্যাস শনাক্তকরণ, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের অনুমতি, অগ্নিনিরাপত্তা, উদ্ধার সরঞ্জাম, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী এবং জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা কার্যকর আছে কি না, তা স্বাধীন ও নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কার্যক্রম স্থগিতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও দায় নির্ধারণ করতে হবে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর তদন্তের ফলাফল, শনাক্ত নিরাপত্তাঘাটতি এবং গৃহীত সংশোধনমূলক ব্যবস্থার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। ভবিষ্যতের প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে।
পঞ্চমত, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। নিহত শ্রমিকের পরিবারকে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ, আহত শ্রমিকের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং নির্ভরশীল সদস্যদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রতিশোধের ভয় ছাড়া অনিয়ম প্রকাশের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
উন্নয়ন হোক, তবে কি মানুষের জীবনের মূল্য দিয়েই :
জাহাজভাঙা শিল্প বন্ধ করা নাকি চালু রাখা—বিষয়টি শুধু এই দুই বিকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই শিল্পকে এমনভাবে পরিচালনা করা যায়, যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, শ্রমিকের জীবন সুরক্ষিত হয় এবং পরিবেশের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা পরস্পরের বিরোধী হতে বাধ্য নয়। সঠিক প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড, কার্যকর পরিদর্শন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্র ও শিল্পমালিকদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এই ঘটনার শিক্ষা হওয়া উচিত নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, তদন্তের ফল কার্যকর করা এবং ভবিষ্যৎ প্রাণহানি ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাহাজভাঙা শিল্পের পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাস শিথিল করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পাঁচ দফা প্রস্তাবের মূল কথাও স্পষ্ট—অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হোক, কিন্তু পরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাব জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা, শ্রমিক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ, একটি শিল্পের সাফল্য শুধু কত টন লোহা উদ্ধার হলো কিংবা কত টাকা আয় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শিল্পে কতজন শ্রমিক নিরাপদে কাজ করে বাড়ি ফিরতে পারলেন, সেটিও সাফল্যের অপরিহার্য মাপকাঠি।
শ্রমিকের জীবন কোনো উৎপাদন ব্যয় নয়। পরিবেশ সুরক্ষা কোনো অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়। শিল্পের উন্নয়ন তখনই জনস্বার্থের উন্নয়ন হবে, যখন মুনাফার পাশাপাশি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে।
শীপ ব্রেকিং গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আমিনুর রসুল বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী জাহাজভাঙা শিল্প লাল শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক। এই বিধান শিল্পটির পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু লাল শ্রেণি থেকে কমলা শ্রেণিতে নামিয়ে আনা হলে ইআইএ বাধ্যতামূলক থাকবে না; পরিবর্তে ইয়ার্ড মালিকদের শুধু প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা জমা দিতে হবে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা অনেকটাই শিথিল হয়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কার স্বার্থে এবং কাদের সুবিধা দিতে এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে ইআইএ বাধ্যতামূলক। যে শিল্পের নামে পরিবেশ, প্রতিবেশ, নদী, মাটি ও বায়ুদূষণ ঘটে, তাকে আদৌ টেকসই শিল্প বলা যায় কি না, তা এখন গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পকে লাল শ্রেণি থেকে কমলা শ্রেণিতে উন্নীত করার উদ্যোগ পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চট্টগ্রামে ১২৫টির বেশি শিপইয়ার্ড থাকলেও সচল রয়েছে ২৫-৩০টি। গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ থাকলেও বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস, বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটছে। ২০২৫-২৬ সালে প্রায় ১০০টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ৭৫ জন আহত হয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দেড় শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মতে, মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে জাহাজভাঙা শিল্পের অগ্রগতি টেকসই হবে না। গ্রিন সনদের কার্যকারিতা ও শিল্পের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
