শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ‘কূটনীতি’: ঋণ, সংস্কার ও বিনিয়োগ সন্ধান

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ‘কূটনীতি’: ঋণ, সংস্কার ও বিনিয়োগ সন্ধান

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভাকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে তিনটি বিষয়। নতুন ঋণ ও বাজেট সহায়তা, অর্থনৈতিক সংস্কারে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ। এর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সভা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভা শুধু নতুন অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের নিজস্ব অগ্রাধিকার তুলে ধরা, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বিনিয়োগের নতুন পথ খোঁজারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

১৬ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি কিংবা বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের নতুন কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়ন প্যাকেজ চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা আসেনি। তবে, বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা এগোনোর কথা জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা।

আইএমএফের নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা

বার্ষিক সভাকে ঘিরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। আগের ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এ অঙ্ক এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, চূড়ান্ত ঋণচুক্তি হিসেবে একে দেখার সুযোগ নেই।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং নতুন ঋণ চুক্তির বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে অবস্থানের মিল রয়েছে।

১৫ অক্টোবর আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পরও অর্থমন্ত্রী আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানান। অর্থনীতি, সংস্কার এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চলমান বৈশ্বিক সংঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট বলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ঋণের পরিমাণ, শর্ত, মেয়াদ ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-পরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আইএমএফের সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

নিজেদের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরছে বাংলাদেশ

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ নিজেদের সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করছে। দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি জাতীয় বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চায়, তা উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

তিতুমীর জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তার মতে, এতে দেশের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ আলোচনার তাৎপর্য হলো, অর্থনৈতিক সংস্কারকে শুধু ঋণের শর্ত পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সুশাসন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এসব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ কমানো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।

জ্বালানি ব্যয় মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তার প্রত্যাশা

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এ বিষয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তির প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

তবে, ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়নের পরিমাণ বা পৃথক প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও সেটিকে চূড়ান্ত অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

বাংলাদেশের জন্য এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই, অর্থায়নের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো, ব্যয় যৌক্তিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

সরকারি অর্থের বাইরে বেসরকারি বিনিয়োগের সন্ধান

এবারের বার্ষিক সভায় বিশ্বব্যাংকের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো, শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য শুধু সরকারি অর্থায়ন বা উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে সংগৃহীত অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ অর্থবছরে ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি অর্থায়নসহ মোট সংগৃহীত অর্থায়ন ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আকর্ষণ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে, এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ কত অর্থ পাবে বা কোন প্রকল্পে অর্থায়ন হবে, তা এখনো নির্দিষ্ট হয়নি।

বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব চুক্তি করবে বিশ্বব্যাংক: অর্থমন্ত্রী

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নকে বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা। এতে শুধু ঋণনির্ভরতা কমবে না, নতুন শিল্প স্থাপন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বাড়বে।

তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা অর্থায়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিনিয়োগের গতি কম থাকা, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, ব্যবসা সম্প্রসারণে অনিশ্চয়তা এবং চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে দক্ষতার ঘাটতি তরুণদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ প্রেক্ষাপটে সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের তহবিল ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়নকে প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের অর্থায়ন থেকে আলাদা করে দেখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এছাড়া, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটকে একটি সমন্বিত পরিচয়ব্যবস্থার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এতে আর্থিক সেবায় প্রবেশ সহজ করা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ

ব্যাংককে অবস্থানকালে বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য, শিল্প উৎপাদন এবং যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে থাই বিনিয়োগ এলে স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে থাইল্যান্ডের বৈদ্যুতিক যানবাহন, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রয়োজন।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ না থেকে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া। তবে, এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে প্রকল্পভিত্তিক আলোচনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এআইয়ের যুগে নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করছে। একইসঙ্গে শ্রমবাজার, শিক্ষা, উৎপাদনব্যবস্থা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে পরিবর্তন আনছে।

বাংলাদেশের জন্য এআই একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন ব্যবসা তৈরি এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ, অন্যদিকে প্রচলিত কিছু কাজের ধরন বদলে যাওয়া এবং দক্ষতার চাহিদা পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ। তাই, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরিতে বিনিয়োগ জরুরি।

প্রত্যাশা থেকে বাস্তব প্রাপ্তির অপেক্ষা

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের আলোচনায় অগ্রগতি ও সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা উঠে এলেও নতুন ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত চুক্তি কিংবা বিশ্বব্যাংকের নতুন নির্দিষ্ট অর্থায়ন প্যাকেজ নিশ্চিত হয়নি।

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ- আইএমএফের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো, বিশ্বব্যাংকের সহায়তাকে দেশের অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া।

সব মিলিয়ে, ব্যাংককের বার্ষিক সভা বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন ঋণের সন্ধান নয়, বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের নিজস্ব পথ নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির সুযোগ।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে দেশটির কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা করেছে সরকার।

তিনি বলেন, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রচলিত ঋণনির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে শুধু সার্বভৌম ঋণ বা অন্যান্য ঋণের ওপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের দিকে এগিয়ে যেতে চায় সরকার।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চীনের সঙ্গে আগামী দিনের বিনিয়োগগুলোতে ঋণের পরিবর্তে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে ঋণ ব্যবস্থাপনায় মার্কিন সহায়তাসহ সামগ্রিক বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ কী ধরনের সহায়তা পেতে পারে, সে বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় এ ধরনের সহায়তা পায়নি। তবে বর্তমানে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য মার্কিন সহায়তা বাড়ানোর সময় এসেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও পণ্যসামগ্রী আমদানি করছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের এই সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের প্রতি আর্থিক সহযোগিতা থাকা উচিত।

কৃষিখাতে সহায়তা নিয়ে ইফাদের সঙ্গে আলোচনা

এদিকে কৃষি খাতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষিখাতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং ইফাদ কীভাবে এক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনাটি ইতিবাচক হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে, দীর্ঘদিন ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। এজন্য আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-পরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারও জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতি এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

আইএমএফের উদ্বেগ

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খাতটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এজন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং খাতটির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে আইএমএফ।

বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিও আইএমএফের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানে এ অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি।

আইএমএফের মতে, উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য, রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমএফ।

এম/আই

Link copied!