মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) :
জাতীয় নিরাপত্তা বলতে সাধারণত দেশের সীমান্ত রক্ষার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি দায়িত্বের একটি অংশ মাত্র। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, অপরাধীরা শাস্তি ছাড়াই কর্মকাণ্ড চালাতে পারলে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে, সাইবার হামলায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়লে, কিংবা সীমান্তের ওপারের সংঘাতে নতুন করে মানুষ বাস্তুচ্যুত হলে দেশের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নিরাপত্তানীতি, যা ভূখণ্ড ও জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে।
সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত জাতীয় নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা—কোন হুমকির সম্ভাবনা কতটা, ক্ষতির মাত্রা কী হতে পারে এবং তা মোকাবিলার দায়িত্ব কার, সে বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া। পরিস্থিতি বদলালে এই মূল্যায়নও হালনাগাদ করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ হলো সারা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রতিশোধে পরিণত না হয়। চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, দুর্নীতি, দখলবাজি, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফিতি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা দ্রুত নষ্ট করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দলের বা যত প্রভাবশালীই হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত, বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও স্পষ্ট দায়িত্ব দিতে হবে; দলীয় নির্দেশের চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য। তবে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্ট গার্ড ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে তাদের দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট থাকতে হবে। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনির্দিষ্টকাল সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করা যায় না। সরকারকে বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সাংবিধানিক কর্তৃত্বের অধীনে একটি পেশাদার সামরিক বাহিনী বজায় রাখতে হবে। বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য ও পরিকল্পনা সমন্বয়ের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সামগ্রিক জবাবদিহিতা থাকবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে।
স্থানীয় অসন্তোষ, বেকারত্ব, অনলাইন প্রচার কিংবা রাষ্ট্রীয় সংস্থার অন্যায় আচরণকে কাজে লাগিয়ে উগ্র গোষ্ঠী সদস্য সংগ্রহ করতে পারে। শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক মতভিন্নতাকে উগ্রবাদের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। জনগণের আস্থা, শিক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন এবং কর্তৃপক্ষের ন্যায়সংগত আচরণ প্রকৃত হুমকি শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভূমি, প্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় প্রশাসন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিরোধ শুধু টহল দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। ভূমি দাবি নিষ্পত্তির বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে; অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে; এবং সাধারণ মানুষকে সহিংসতা ও ভয়ভীতি থেকে রক্ষা করতে হবে। সশস্ত্র অপরাধ দমনে অভিযান আইনানুগ ও জবাবদিহিতামূলক হওয়া জরুরি। অধিকার, সেবা ও স্থানীয় আস্থার উন্নতি হলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগও কমবে।
মিয়ানমার সীমান্তে বহুমাত্রিক বাহ্যিক হুমকি রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের ফলে বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র সংঘাত সীমান্তে ছড়িয়ে পড়া, পাচার, অপহরণ, অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষ এবং নতুন করে মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নির্ভরযোগ্য নজরদারি, দ্রুত যোগাযোগ এবং সীমান্তবাসী ও জেলেদের সুরক্ষার পরিকল্পনা থাকা দরকার। একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো ঘটনা যেন বড় সংঘাতে রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট এই সীমান্ত পরিস্থিতি থেকে আলাদা নয়। বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের জন্য জরুরি সেবা বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে। শিবিরে অপরাধ, মানবপাচার এবং আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ—সবকিছুর দিকে নজর দিতে হবে। সরকারকে মানবিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ দমনে নির্দিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; সব শরণার্থীকে একসঙ্গে সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না। প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলতে হবে, কিন্তু ফিরে যাওয়া হতে হবে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে এবং মিয়ানমারে তার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ থাকতে হবে। এই দীর্ঘ সংকটের ব্যয় বহনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরো নিয়মিত সহায়তা এবং আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য সমর্থন চাইতে হবে।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, বন্দর এবং সমুদ্রের সম্পদ রক্ষা করতে হবে। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বেসামরিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ, নজরদারি, উদ্ধার সক্ষমতা এবং দ্রুত ঘটনার প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। অবৈধ মাছ ধরা, চোরাচালান ও নৌপথে অপরাধের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও প্রবল ঝড়ের প্রস্তুতিও থাকতে হবে। স্থল ও আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজন বিবেচনা করেই সামরিক আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ যোগাযোগ এবং নিয়মিত পরিচালনার অর্থ না থাকলে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম কিনেও কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা পাওয়া যাবে না।
সাইবার নিরাপত্তা এখন জাতীয় প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, বন্দর, হাসপাতাল ও সরকারি নথি—সবই ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সাইবার হামলা বা বড় ধরনের তথ্য ফাঁস কোনো গুলি ছাড়াই দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যূনতম সাইবার নিরাপত্তার মান, দ্রুত হামলার তথ্য জানানোর নিয়ম, বিকল্প ব্যবস্থার পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত জরুরি সাড়া দেওয়ার দল দরকার। ভোটার ও জাতীয় পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য বিশেষ সুরক্ষা দাবি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া ছবি, কণ্ঠ বা ভিডিওসহ অনলাইন অপতথ্য মোকাবিলায় দ্রুত সত্য তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল সচেতনতা প্রয়োজন। বৈধ মতপ্রকাশের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করলে অপতথ্য মোকাবিলার জন্য যে জনআস্থা প্রয়োজন, সেটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জাতীয় নিরাপত্তার শর্ত। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে পরিবার, কলকারখানা ও সরকারি সেবায়। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট দেখিয়েছে, সরবরাহের সমস্যা কত দ্রুত বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য ও জীবিকায় আঘাত হানে। সরকারকে জ্বালানির উৎস ও সরবরাহকারী বৈচিত্র্যময় করতে হবে; মজুত ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা উন্নত করতে হবে; অপচয় কমাতে হবে; এবং যেখানে বাস্তব সুবিধা রয়েছে, সেখানে দেশীয় সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে হবে। জরুরি খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা এবং সংকট মোকাবিলার মতো সরকারি আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখাও প্রয়োজন। এসব উদ্যোগের ফল পেতে সময় লাগে, তাই পরবর্তী সংকটের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই কাজ শুরু করতে হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকির মতো গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে; তবু বদলে যাওয়া ঝুঁকির জন্য টেকসই সড়ক, হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র, যোগাযোগ ও পানির ব্যবস্থা দরকার। বিশেষ করে উপকূল, নদীতীর ও মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মানুষকে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকরভাবে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। দুর্যোগে নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে, তবে সমন্বয়ের দায়িত্ব বেসামরিক প্রশাসনের কাছে স্পষ্টভাবে থাকা উচিত।
পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হতে হবে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা। কোনো একক অংশীদারের ওপর এমন নির্ভরতা তৈরি করা উচিত নয়, যাতে বাংলাদেশের নিজস্ব বিকল্প সংকুচিত হয়। বড় ঋণ, অবকাঠামো প্রকল্প ও প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণ ব্যয় এবং কৌশলগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হলে দেশের স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, ধারাবাহিক আলোচনা চালানো এবং বিরোধ মেটানোর পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।
সবশেষে, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে, তা জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। সংবেদনশীল অভিযানের তথ্য গোপন রেখেও সরকার একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করতে পারে। সংসদ সামগ্রিক লক্ষ্য ও ব্যয় পর্যালোচনা করবে; স্বাধীন নিরীক্ষকেরা বড় ক্রয়প্রক্রিয়া পরীক্ষা করবেন; এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা অগ্রগতি জানাবেন। সহিংস অপরাধের হার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর প্রস্তুতি, সীমান্তের ঘটনায় সাড়া দেওয়ার সময় এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মতো বাস্তব সূচকে কাজের ফল বিচার করা উচিত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে উঠবে সক্ষম সশস্ত্র বাহিনী, আস্থাভাজন বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম অর্থনীতি এবং আইনের সুরক্ষার ওপর জনগণের বিশ্বাসের সমন্বয়ে। যেখানে জীবন বিপন্ন, সেখানে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে; পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানও গড়তে হবে। নাগরিক নিজের ঘরে নিরাপদ থাকলে, রাষ্ট্র সংকট সামলাতে পারলে এবং বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই জাতীয় নিরাপত্তা সত্যিকার অর্থে শক্ত ভিত্তি পাবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
hrmrokan@hotmail.com
