বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি হয়েছে। জরিমানা হয়েছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু সেই এক টাকা জমা দিতে যেতে হবে ব্যাংকে, দাঁড়াতে হবে লাইনে, শেষ করতে হবে আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী নাবিলা হকের কাছে বিষয়টি যেন এক টাকার চেয়ে অনেক বেশি ভোগান্তির।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বই ফেরতে বিলম্বের জরিমানা দিতে এখনো ব্যাংকে ছুটতে হয় শিক্ষার্থীদের। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হকের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসে। মোকাররম ভবন এলাকায় অবস্থিত বিজ্ঞান পাঠাগার থেকে নেওয়া বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি হওয়ায় তাকে এক টাকা জরিমানা করা হয়। সেই টাকা জমা দিতে বলা হয় টিএসসিতে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায়।
নাবিলা জানান, পূজার ছুটির মধ্যে বই ফেরতের নির্ধারিত তারিখ পড়ায় সময়মতো বই জমা দিতে পারেননি তিনি। পরে এক টাকা জরিমানা পরিশোধের জন্য ব্যাংকে যাওয়ার বিষয়টি তার কাছে অযৌক্তিক ও বিরক্তিকর মনে হয়েছে।
জরিমানার হার নিয়েও অসংগতি
শুধু জরিমানা পরিশোধের পদ্ধতিই নয়, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটে জরিমানার হার নিয়েও অসংগতি দেখা গেছে। ওয়েবসাইটের এক অংশে প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে এক টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪নং বিধিতে প্রতি বইয়ের জন্য প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষে ২৫ পয়সা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব দপ্তরে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ব্যাংকের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক সেলিম রেজা বলেন, সামান্য পরিমাণ জরিমানা জমা দিতে ব্যাংকে যাওয়া ও লাইনে দাঁড়ানোর এ নিয়ম সময়সাপেক্ষ এবং অপ্রয়োজনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সেবা অনলাইনভিত্তিক হওয়ার পাশাপাশি গ্রন্থাগারের জরিমানাও অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
৪০-৫০ বছরের পুরোনো নিয়ম
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক বলেন, ব্যাংকের মাধ্যমে জরিমানা আদায়ের নিয়ম প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর বা তারও আগে থেকে চলে আসছে। তবে সামান্য অর্থ জমা দিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে যাওয়ার বিষয়টি অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, জরিমানা পরিশোধের বিকল্প ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
কিউআর কোডে টাকা জমার উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মোহাম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় গ্রন্থাগারের জরিমানার অর্থও ব্যাংকে জমা দিতে হয়। তবে এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের সময়মতো বই ফেরত দিতে একধরনের শাস্তি হিসেবেও কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, জরিমানা পরিশোধের পদ্ধতি অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে কিউআর কোডের মাধ্যমে জরিমানার অর্থ জমা দিতে পারেন, সে বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার এ সুবিধা চালু হয়।
তবে ডিজিটাল সেবার আওতা বাড়লেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের জরিমানা পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনো যুক্ত হয়নি অনলাইন ব্যবস্থা। ফলে এক টাকা জরিমানা দিতে শিক্ষার্থীদের ছুটতে হচ্ছে ব্যাংকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আর্থিক সেবা যখন ডিজিটাল হচ্ছে, তখন এক টাকা জমা দেওয়ার এই কয়েক দশক পুরোনো পদ্ধতি কবে বদলাবে, এখন সেটিই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন।
