সিলেট মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি)-এর একাডেমিক ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট (BHPI)-এর অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একদল শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় জরিপের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে সমস্যার সম্মুখীন ব্যক্তিদের শনাক্ত করে, পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা প্রদান করছে যা একটি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা দৈনন্দিন জীবনে নিজের যত্ন, পড়াশোনা, কাজ, বিনোদন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে—যতটা সম্ভব স্বনির্ভর ভাবে অংশগ্রহণ করতে একজন ব্যক্তিকে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে ।
এরই ধারাবাহিকতায়, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে হিঙ্গাজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে, অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের প্রভাষক, মো: আজিম হোসেন এবং দিশা বিশ্বাস এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যার প্রতিপাদ্য বিষয়— “জীবনের অভিজ্ঞতা শুনি: সত্যিকারের কথা, সত্যিকারের পরিবর্তন।“ বর্তমানে বাংলাদেশে যদি দেখি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত ২০১৮- –২০১৯ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১৮—৯৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮.৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। শিশুদের (৭–১৭ বছর) মধ্যেও এ হার প্রায় ১২.৬ শতাংশ। নারীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি—যথাক্রমে ২১.৫ শতাংশ ও ১৫.৭ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবা থেকে বঞ্চিত। জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসা ঘাটতি (treatment gap) প্রায় ৯২.৩% শতাংশ, অর্থাৎ আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করছেন না; শিশুদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা না পাওয়ার হার প্রায় ৯৪.৫% শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, জনসচেতনতা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলা ও এর ব্যতিক্রম নয়।
এই জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির জন্য অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা কিশোর-কিশোরীদের কে বেছে নেয়ার কারণ তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নানা ধরনের মানসিক চাপ ও আবেগীয় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ারও ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া তাদের হাত ধরেই সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সম্বন্ধে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাদের এই আয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ ও শনাক্তকরণ, মানসিক চাপ মোকাবিলা, সুস্থ জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে যথাযথ পেশাজীবীর কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে মানসিক রোগ নিয়ে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার, ভুল ধারণা ও নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।
অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অকুপেশনাল থেরাপির শিক্ষার্থীদের এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কমিউনিটিতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, তাদের তিনদিন ব্যাপী জরিপে মোট ১৩৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত করা যায় যার মধ্যে স্ট্রোকের হার ছিল সর্বাধিক (৩৪.৮%), দ্বিতীয় অবস্থানেই আছে সেরিব্রাল পালসি (১৬.৭%), অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা মাসকুলোস্কেলিটাল জনিত (১৩.৭%), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা (৬.৫%) এবং অন্যান্য রোগ যা কমিউনিটি পর্যায়ে পুনর্বাসনসেবা ও অকুপেশনাল থেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরে।
আয়োজকরা মনে করেন, “প্রতিবন্ধিতা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কোনো ব্যক্তির জীবনের শেষ নয়; উপযুক্ত পুনর্বাসন, সহায়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা একজন মানুষকে আবারও তার প্রয়োজনীয় ও অর্থবহ কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনতে পারে।” এ ক্ষেত্রে অকুপেশনাল থেরাপি কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
