শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

স্ট্রোক কী, কেন হয়? দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি যে কারণে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

স্ট্রোক কী, কেন হয়? দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি যে কারণে

একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন। হঠাৎ তার কথা জড়িয়ে গেল, মুখের এক পাশ বেঁকে গেল অথবা হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। পরিবারের কেউ ভাবলেন, দুর্বলতা হয়েছে; একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই অপেক্ষাই বিপজ্জনক হতে পারে। এগুলো স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে, আর স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান।

আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। ২০২৬ সালের বিশ্ব স্ট্রোক সচেতনতা প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে লক্ষণ দ্রুত চেনা এবং অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার ওপর। বার্তাটি সহজ—‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।’ সচেতনতা তখনই কাজে আসে, যখন বিপদের মুহূর্তে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। 

স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?

মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল হঠাৎ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। রক্তনালি বন্ধ হয়ে হওয়া স্ট্রোককে বলা হয় ইস্কেমিক স্ট্রোক এবং রক্তক্ষরণের কারণে হওয়া স্ট্রোককে বলা হয় হেমোরেজিক স্ট্রোক। উভয় অবস্থাই জরুরি চিকিৎসার বিষয়। স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ; হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। 

লক্ষণ চিনতে মনে রাখুন ‘FAST’

স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। সহজে মনে রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হয় ‘FAST’:

F—Face বা মুখ: হাসতে বললে মুখের এক পাশ কি বেঁকে যাচ্ছে বা ঝুলে পড়ছে?

A—Arms বা হাত: দুই হাত তুলতে বললে একটি হাত কি তুলতে পারছেন না, অথবা একটি হাত নিচে নেমে যাচ্ছে?

S—Speech বা কথা: কথা কি জড়িয়ে যাচ্ছে, অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে অথবা সহজ কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে?

T—Time বা সময়: এসবের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবার সাহায্য নিন। সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না।

এছাড়া হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো অথবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্ট্রোকে সব সময় ব্যথা হয় না; তাই ব্যথা নেই বলে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। 

প্রথম কয়েকটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

স্ট্রোক সন্দেহ হলে স্থানীয় জরুরি নম্বরে ফোন করুন এবং সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিন। রোগীকে নিজে গাড়ি চালাতে দেবেন না। লক্ষণ শুরুর সময় লিখে রাখুন। কখন শুরু হয়েছে জানা না থাকলে, তাকে সর্বশেষ কখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে, সেটি চিকিৎসককে জানানোর জন্য মনে রাখুন। 

গিলতে সমস্যা আছে কি না বোঝার আগেই রোগীকে পানি, খাবার বা মুখে ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এগুলো শ্বাসনালিতে ঢুকে যেতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিনও দেবেন না; সব স্ট্রোক রক্ত জমাটের কারণে হয় না, কিছু স্ট্রোকে রক্তক্ষরণ থাকে। 

লক্ষণ সেরে গেলেও বিপদ শেষ নয়

অনেক সময় কয়েক মিনিট পর কথা স্বাভাবিক হয়ে যায় বা হাতের দুর্বলতা কমে আসে। এতে মনে হতে পারে, আর হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটি ক্ষণস্থায়ী মস্তিষ্কের রক্ত চলাচলের সমস্যার লক্ষণ বা টিআইএ হতে পারে। বাড়িতে বসে টিআইএ ও স্ট্রোক আলাদা করা সম্ভব নয়। লক্ষণ চলে গেলেও জরুরি মূল্যায়ন প্রয়োজন। 

দ্রুত হাসপাতালে গেলে কী লাভ

হাসপাতালে পরীক্ষা ও মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করা হয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের জমাট গলানোর চিকিৎসা অথবা বিশেষ পদ্ধতিতে জমাট অপসারণের সুযোগ থাকতে পারে। রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা ভিন্ন। কোন চিকিৎসা দেওয়া যাবে, তা নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, পরীক্ষার ফল এবং সময়ের ওপর। 

তবে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে মনে করে হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করা যাবে না। লক্ষণ নিয়ে ঘরে অপেক্ষা করার চেয়ে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত।

প্রতিরোধের শুরু নিয়মিত স্বাস্থ্যপরিচর্যায়

উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ গ্রহণ, তামাক বর্জন, লবণ কম খাওয়া, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। হৃদ্‌যন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দনসহ সংশ্লিষ্ট রোগের যথাযথ চিকিৎসাও প্রয়োজন। 

স্ট্রোকের পরও ফিরে আসার পথ আছে

স্ট্রোকের পর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুনর্বাসন। রোগী চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ, কথা বলা ও গিলতে পারার থেরাপি এবং মানসিক সহায়তা শুরু করা হয়। লক্ষ্য হলো রোগীর সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জীবনমান যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা। 

পরিবারের দায়িত্ব রোগীকে সাহস দেওয়া, তার কথা মন দিয়ে শোনা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা অনুসরণে সহায়তা করা। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে বলে তার মতামত বা মর্যাদাকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। পরিবারের যত্নদাতার বিশ্রাম ও সহায়তার প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবসে প্রতিটি পরিবারের একটি প্রস্তুতি থাকতে পারে—স্ট্রোকের লক্ষণ জানা, স্থানীয় জরুরি নম্বর কাছে রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত সাহায্য চাওয়া। মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়াকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা নয়—অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন। আপনার দ্রুত সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

এম/আর

Link copied!