বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেলজয়ীকে কেন অভিনন্দন জানায়নি মোদী সরকার?

মুক্তবাণী রিপোর্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেলজয়ীকে কেন অভিনন্দন জানায়নি মোদী সরকার?

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই। তবে পুরস্কার ঘোষণার চারদিন পরও তাকে অভিনন্দন জানায়নি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। যেখানে ভারতের সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্কযুক্ত কেউ আন্তর্জাতিক মহলে খ্যাতি কুড়ালে তা নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গোটা ভারত, সেখানে নাভি পিল্লাইকে কেন এমন রহস্যময় নীরবতা? এ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে মোদী সরকার।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাভি পিল্লাইয়ের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আফ্রিকায় শ্রম দিতে যাওয়া ভারতীয়দের বংশধর।

হাসিনার ‘দুঃশাসন’ নিয়েও সরব ছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই

ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের সাফল্যকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। সেই বিবেচনায় নাভি পিল্লাইকে অভিনন্দন না জানানোর বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ অক্টোবর নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

কেন নীরব ভারত সরকার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার ২০১৪ সালের পর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।

নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমিশন জানায়, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে।

নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন, নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। নাভি পিল্লাইকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত করেন তিনি।

দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে নাভি পিল্লাইয়ের অবস্থান কি ভারত সরকারের নীরবতার একটি কারণ? তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।

নাভি পিল্লাইকে অভিনন্দন জানানো হবে কি না, তা জানতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও জবাব পায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজ

৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

আমার মতো মানুষকে নোবেল দেওয়া হয় না: আফসোস ট্রাম্পের

১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিলেন। এর মধ্যে চার বছর ট্রাইব্যুনালের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ছিলেন। পরে ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গণহত্যা ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের ক্লেয়ারউড এলাকায় বেড়ে ওঠা নাভি পিল্লাইয়ের। সেখানকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষেরা তার নোবেলজয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন।

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়সহ ভারতের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের অবস্থান

ভারত দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে ২০১৪ সালের পর ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র উৎপাদন, সামরিক সরঞ্জাম ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছে। এসব সম্পর্কের কারণে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে ভারতের অবস্থান নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

চলতি বছর নেতানিয়াহুর আমন্ত্রণে ইসরায়েল সফর করেন মোদী। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

এ অবস্থায় ফিলিস্তিন প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নাভি পিল্লাইকে অভিনন্দন না জানানোর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সমালোচকদের স্বীকৃতি দিতে মোদী সরকারের অনীহা?

দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন ভারতীয়র উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, যাদের আন্তর্জাতিক অর্জনের পরও মোদী সরকার থেকে উল্লেখযোগ্য অভিনন্দনবার্তা আসেনি।

তাদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারজয়ী বানু মুশতাক ও গীতাঞ্জলি শ্রী, সাংবাদিক রবীশ কুমার, মানবাধিকারকর্মী বেজওয়াদা উইলসন এবং শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ।

এদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন।

এ ছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামসের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালে গুজরাটে গেলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদী তাকে রাজ্যের অতিথির মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে দীর্ঘ মহাকাশ অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফেরার পর মোদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইলিয়ামসের প্রশংসা করেন।

এই তুলনা টেনে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া কি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে?

এম/আই

Link copied!