মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলাভঙ্গ, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অসদাচরণ, দুর্নীতি ও মাদক গ্রহণের অভিযোগে সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।

সোমবার(২৬ অক্টোবর)  চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালুর অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান। একই অনুষ্ঠানে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার এবং মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
এছাড়াও গত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্য রয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আবার মাদক গ্রহণের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল আসায় কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তারও চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা ও সরকারি দায়িত্ব পালনে অসদাচরণের অভিযোগে চার পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের খবর প্রকাশিত হয়। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার সঞ্জিত কুমার রায়, সাবেক উপকমিশনার মানস কুমার পোদ্দার, রংপুরের সাবেক পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাফিজ আল ফারুক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
একই দিন আরও তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার খবর আসে। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুলিশের উপপরিদর্শক পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়। মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. হাবিবুল্লাহ দালালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ আনা হয়। বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে চাকরিসংক্রান্ত শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পুলিশ সদস্যদের মাদক গ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসে সেপ্টেম্বরে। ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় পুলিশ সুপার (টিআর) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনকে ১০ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পুলিশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন পরে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। মিরপুর সেনানিবাসে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের একটি কোর্সে অংশ নেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে করা ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে পুলিশের ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে সরকার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, সিরাজগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিভাগীয় মামলায় অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর বিধি অনুযায়ী তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ছয় পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির অবসানের খবর প্রকাশিত হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী ও শহীদুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম এবং সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
২৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে পুলিশের আরও দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান এবং গাজীপুরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী। পরদিন এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এস এম মেহেদী হাসান ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, রহমত উল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হয়।
অক্টোবরেও পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তীকে অসদাচরণ ও চাকরির বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহীতে কর্মরত থাকার সময় ছুটি শুরুর আগে যথাযথ প্রস্থান-প্রতিবেদন জমা না দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ এবং শাহ মখদুম বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সময় নিজেকে ডিআইজি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের চালক কনস্টেবল মো. ওসমান গনিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁর ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর জেলা পুলিশ এ সিদ্ধান্ত নেয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তাঁর আচরণ ও গতিবিধি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্দেহ তৈরি হলে তাঁকে নজরদারিতে রেখে ডোপ টেস্ট করানো হয়। কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পরীক্ষার পর ফল ইতিবাচক আসে। এরপর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এদিকে, সোমবার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালুর অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার এবং মাদক কারবারের সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করার কথাও জানান তিনি।
আইজিপি বলেন, সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে। তবে স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করা যাবে না। আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কথায় কথায় পুলিশের ওপর দায় চাপানোও ঠিক নয়। সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পুলিশ পিছপা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, তা পুলিশের বিষয় নয় উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, দেশে কেউ কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি করলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় স্থায়ী বরখাস্ত ও সাময়িক বরখাস্ত—দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কোথাও চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত হয়েছে, আবার কোথাও তদন্ত চলাকালে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি ঘটনায় অভিযোগের ধরন, তদন্তের ফল এবং গৃহীত ব্যবস্থার প্রকৃতি আলাদা।

এম/আই

Link copied!