বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬

অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারে বাড়ছে শিশুদের স্থূলতার ঝুঁকি

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারে বাড়ছে শিশুদের স্থূলতার ঝুঁকি

যেসব শিশু অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খায়, তারা মুখরোচক খাবারের ছবি দেখলে মস্তিষ্কে আনন্দের অনুভূতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর মস্তিষ্কের এই অতিরিক্ত সক্রিয়তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে শরীরে চর্বি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় কী দেখা গেছে

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বেশি পরিমাণে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়, তাদের মস্তিষ্কে আকর্ষণীয় খাবারের ছবি দেখার সময় বিশেষ একটি অংশে বেশি কার্যক্রম দেখা যায়। শুধু তাই নয়, মস্তিষ্কের এই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরবর্তী এক বছরে শিশুদের শরীরের চর্বি ও বডি মাস ইনডেক্স বেড়ে যাওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে রয়েছে সকালের নাশতার সিরিয়াল, প্যাকেটজাত পাউরুটি, ইনস্ট্যান্ট স্যুপসহ নানা ধরনের পরিচিত খাবার। এসব খাবার সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সেগুলো সহজে খাওয়া যায়, স্বাদে আকর্ষণীয় হয় এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে। এগুলোতে প্রায়ই কৃত্রিম মিষ্টিকারক, রং ও এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত ঘরের রান্নায় ব্যবহৃত হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের খাদ্যতালিকায় এসব খাবারের প্রভাব বেশ বড়। দেশটির শিশুদের দৈনিক মোট ক্যালরির প্রায় ৬৭ শতাংশই আসে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে।

আগের বিভিন্ন গবেষণায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব খাবার কীভাবে শরীরে এমন প্রভাব ফেলে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার কেক স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ক্যাথলিন এ পেজ বলেন, শিশুদের মস্তিষ্ক তখনো বিকশিত হতে থাকে। একই সময়ে তাদের খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয় এবং খাবারের প্রতি পছন্দ-অপছন্দ গড়ে ওঠে। এ সময় মস্তিষ্ক খাবার ও চারপাশের খাদ্যপরিবেশের প্রতি বেশি সংবেদনশীল থাকে। তাই শৈশবেই এসব বিষয় বুঝতে পারলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

মস্তিষ্কের স্ক্যানে ভবিষ্যতে ওজন বাড়ার ইঙ্গিত

গবেষণায় সাত থেকে ১০ বছর বয়সি ৪৬ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা চলমান ব্রেইনচাইল্ড গবেষণার অংশ ছিল। শিশুদের ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকির পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করে, তা খুঁজে বের করাই এই গবেষণার উদ্দেশ্য।

গবেষণার শুরুতে সব শিশুর ওজন স্বাভাবিক ছিল। ফলে অতিরিক্ত ওজন তৈরি হওয়ার আগেই শরীরে কী ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা দিতে পারে, তা বোঝার সুযোগ পান গবেষকেরা।

প্রথমে শিশুদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করা হয়। এ সময় তাদের কুকিজ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় খাবারের ছবি দেখানো হয়। পাশাপাশি তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং বডি মাস ইনডেক্স, শরীরের চর্বির পরিমাণ ও কোমরের মাপ নেওয়া হয়। এক বছর পর একই শারীরিক মাপগুলো আবার নেওয়া হয়, যাতে পরিবর্তনগুলো বোঝা যায়।

মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখতে পান। যেসব শিশু বেশি অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খায়, তাদের মস্তিষ্কের ডরসাল স্ট্রায়াটাম নামের অংশটি খাবারের ছবি দেখার সময় বেশি সক্রিয় হয়।

মস্তিষ্কের এই অংশটি আনন্দ, পুরস্কারের অনুভূতি ও কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা প্রেরণা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাই আকর্ষণীয় খাবারের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব শিশুর মস্তিষ্কের এই অংশে বেশি সক্রিয়তা ছিল, পরবর্তী এক বছরে তাদের বিএমআই ও শরীরের চর্বির পরিমাণও তুলনামূলক বেশি বেড়েছে।

গবেষকদের ধারণা, খাবারের প্রতি মস্তিষ্কের অতিরিক্ত আকর্ষণ বা সংবেদনশীলতা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে ওজন বেড়ে যাওয়ার মধ্যকার সম্পর্কের একটি কারণ হতে পারে।

মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে শরীরের চর্বি বৃদ্ধির সম্পর্ক

গবেষণার এক বছর শেষে দেখা যায়, যেসব শিশু বেশি অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়েছে, তাদের বিএমআই, শরীরের চর্বির পরিমাণ এবং কোমরের মাপ তুলনামূলক বেশি ছিল।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিশুদের মস্তিষ্কের ডরসাল স্ট্রায়াটামের কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়ার পর অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে বিএমআই বৃদ্ধির সম্পর্ক ৩১ শতাংশ কমে যায়। একইভাবে শরীরের চর্বির পরিমাণের সঙ্গে এই সম্পর্ক কমে ৪৪ শতাংশ।

এর অর্থ হলো, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ও শরীরের গঠন পরিবর্তনের মধ্যকার সম্পর্কের একটি অংশ ব্যাখ্যা করতে পারে মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া।

ক্যাথলিন এ পেজ বলেন, এই গবেষণা শুধু অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখায়নি; বরং সময়ের সঙ্গে শরীরের গঠন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এসব খাবারের সম্ভাব্য স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রভাব সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছে।

শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার সহজলভ্য করা জরুরি

গবেষকদের মতে, শিশুদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। কারণ অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সাধারণত কম দামে পাওয়া যায়, সহজলভ্য এবং দ্রুত তৈরি করা যায়। ফলে সময় ও অর্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এমন পরিবারগুলোর জন্য এসব খাবার অনেক সময় সুবিধাজনক বিকল্প হয়ে ওঠে।

ক্যাথলিন এ পেজের মতে, স্বাস্থ্যকর ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য খাদ্যপরিবেশের পরিবর্তন জরুরি। এটি সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা

তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা হওয়ায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার কারণেই মস্তিষ্কের কার্যক্রম বেড়েছে কিংবা ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। গবেষণায় বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, কিন্তু একটির কারণে অন্যটি ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এদিকে ব্রেইনচাইল্ড গবেষণার আওতায় শিশুদের বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শরীরের গঠন, খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

গবেষকদের আশা, দীর্ঘ সময় ধরে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে শৈশবের খাদ্যাভ্যাস কীভাবে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সূত্র: সাইন্স ডেইলি

এম/আর

Link copied!