সংবিধানের মূলভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন করা যেতে পারে, তবে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ভিত্তি উপড়ে ফেলে নতুন ভিত্তি তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি অস্বীকার করে কোনো সংস্কার হতে পারে না। সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি ধরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনই হওয়া উচিত।
সংবিধান দিবস উপলক্ষে বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন তিনি। আলোচনা সভার আয়োজন করে গণফোরাম।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘সংস্কার আর সংশোধনের মধ্যে তফাত আছে। ভিত্তি মানি না, নতুন করে ভিত্তি স্থাপন করা হলো সংস্কার। আর সংশোধন হলো- আমি ভিত্তি মানি, ৭২-এর সংবিধানের ভিত্তি আমি মানি। সেই ভিত্তির মধ্যে যদি কোনো কারণে আজকের প্রেক্ষাপটে কাজ করতে না পারি, সংবিধান যদি আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমরা সবাই মিলে পরিবর্তন করবো। এর নাম হলো সংশোধন।’
তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি বাদ দিয়ে নতুন করে সংবিধান লেখার উদ্যোগই সংস্কার। কিন্তু সংবিধানে এমন কিছু মৌলিক প্রতিষ্ঠিত সত্য রয়েছে, যা পরিবর্তনের অধিকার কারও নেই। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখেই সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের নামকে রাষ্ট্রের অপ্রতিস্থাপনযোগ্য ভিত্তি উল্লেখ করে ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রসত্তার মূল ভিত্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। সংসদের সাড়ে তিনশ এমপি কিংবা দেশের ১৮ কোটি মানুষও যদি একমত হয়ে বলে, এ দেশের নাম বাংলাদেশ থাকবে না অথবা ১৯৭১ সালে কোনো যুদ্ধ হয়নি, তবুও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, ক্যালেন্ডারের পাতায় যত দিন ২৬ মার্চ ১৯৭১ থাকবে, তত দিন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সত্য অটুট থাকবে। এই মৌলিক সত্য এবং বাংলাদেশের নাম পরিবর্তনের অধিকার কারও নেই।
সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, সংবিধানের ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ‘আইনের বিধিনিষেধ সাপেক্ষে’ শর্ত যুক্ত করে নাগরিকের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিধিনিষেধের প্রতিবাদ করে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলই এই বিধিনিষেধের ধারা পছন্দ করে। কারণ, তারা ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। নাগরিকের বিবেকের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে এই শর্ত তুলে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে নির্বাচনি অনিয়মের ইতিহাস তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন থেকেই অনিয়ম ও জালিয়াতির সূচনা হয়। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ৪১টিতে অনিয়ম ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল।
তিনি বলেন, দাউদকান্দি আসনে পরাজিত খন্দকার মোশতাককে জোর করে জয়ী করিয়ে আনা হয়েছিল। এর মাশুল পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দিতে হয়েছে। ওই নির্বাচনে তারাও কর্মী হিসেবে অতিরিক্ত উৎসাহে ভোট বাড়িয়েছিলেন, যাতে প্রতিপক্ষের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই অনিয়ম আরও বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনার এমন ব্যক্তি হতে হবে, যিনি কোনো রাজনৈতিক নেতার পায়ে ধরে পদ বাগিয়ে নেবেন না কিংবা কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না।
আইন ও নীতির প্রশ্নে অনড় থেকে যোগ্য প্রার্থীদের অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ এবং প্রতিটি ভোটের সঠিক গণনা ও ফলাফল ঘোষণা নিশ্চিত করতে পারবেন, এমন সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। সভা সঞ্চালনা করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মিজানুর রহমান।
এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক প্রমুখ।
