বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
বাড়ছে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা

অপপ্রচার ছাপিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে সুদৃঢ় অবস্থান গড়ছে সশস্ত্র বাহিনী

মুক্তবাণী রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

অপপ্রচার ছাপিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে সুদৃঢ় অবস্থান গড়ছে সশস্ত্র বাহিনী

সশস্ত্র বাহিনী

বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার ও নেতিবাচক প্রচারণার মধ্যেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। একই সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতাও। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষকেরা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক সভাপতি শেখ হাসিনার কথিত একটি অডিও-ভিডিও বার্তাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

বিশেষ করে ‘নিউ ইয়র্ক বাংলা লাইফ’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই বার্তায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া নিয়ে অসত্য দাবি করার পাশাপাশি ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়ার’ মতো উসকানিমূলক হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর দায় এড়াতে এবং প্রবাসীদের আবেগকে পুঁজি করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা থেকেই এমন রাজনৈতিক কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তবে তাঁদের ভাষ্য, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীর সংখ্যা কমে যাওয়াকে অভ্যন্তরীণ বা কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মূলত ২০১৮ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জাতিসংঘের প্রধান অর্থায়নকারী দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বকেয়া অর্থ ও বাজেট সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে।

সূত্রের দাবি, আর্থিক সংকটের কারণে জাতিসংঘ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শান্তিরক্ষা বাজেট ১০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। মালির পর গত ১ নভেম্বর পশ্চিম সাহারায় ৩৫ বছর ধরে চলা মিশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জাতিসংঘের মিশন সংকোচনের প্রভাবে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষীর সংখ্যা কমেছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম থেকে চতুর্থ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে।

শুধু জাতিসংঘ মিশন নয়, এর বাইরেও বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি সদস্য বিভিন্ন দেশের দ্বিপাক্ষিক ও হাইব্রিড মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠনে (ওকেপি) কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে মোট ৫ হাজার ৭৬৮ জন সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় বৈদেশিক মোতায়েন।

একইভাবে হাইতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোর্সের (জিএসএফ) আওতায় গত অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে মোট ১ হাজার ৪০০ সদস্য মোতায়েনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে ২৩০ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল হাইতিতে অবস্থান করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ ঘটছে। এর ফলে দেশের সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, কাতারে কর্মরত বাংলাদেশ মিলিটারি কন্টিনজেন্টের (বিএমসি) সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন কোস্ট অ্যান্ড বর্ডার সিকিউরিটিতে (কিউসিবিএস) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৩৭ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ৫ নভেম্বর আরও ২৪ জন সদস্য যোগ দিলে সেখানে নৌবাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ১৬১ জনে।

পাশাপাশি কাতার সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের জন্য আরও ৫০০টি নতুন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

কাতারের পাশাপাশি সৌদি আরবেও নতুন মেরিটাইম অ্যালায়েন্সের আওতায় দুটি ফ্রিগেট ও একটি এয়ার ডিফেন্স (এডি) ব্যাটারিসহ মোট ১ হাজার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে সংকটের দাবি করা হচ্ছে, তার পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ নেই। বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচনের মধ্যেও বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

তাদের মতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সামরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!