যশোরসহ আশ-পাশের জেলার হাজার হাজার হৃদরোগীর দীর্ঘ দুই দশকের চিকিৎসাকষ্ট ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। যশোরের একটিমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২৮ শয্যাবিশিষ্ট স্বাতন্ত্র করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার পথে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি হয়েছে। হাসপাতালটির সিসিইউর জন্য রাজস্বখাতে মোট ২৪টি পদ সৃজনে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-২-এর ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখা-৬ থেকে এ সংক্রান্ত একটি স্মারক জারি করা হয়। উপসচিব শুক্লা সরকার স্বাক্ষরিত এই স্মারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ১৮ আগস্ট এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ২৪ সেপ্টেম্বরের স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে এ সম্মতি দেওয়া হয়।
এদিকে সিসিইউ চালু করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে যশোর মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কর্যক্রম সরিয়ে নিয়েছেন। চলছে সেখানে ধোয়া মুছার কাজ।
অর্থ বিভাগ থেকে চূড়ান্ত সম্মতি পাওয়া রাজস্বখাতে মোট ২৪টি পদের মধ্যে ১৫টি ক্যাডার পদ স্থায়ী ও ৯টি অস্থায়ী। এই ৯টি পদ বছরভিত্তিক সংরক্ষণের ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে সৃজন করা হবে। উল্লেখিত পদগুলোর মধ্যে রয়েছে, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) ১টি, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ১টি, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) ২টি, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ১টি, সহকারী রেজিস্ট্রার ১টি, অ্যানেসথেটিস্ট ১টি, মেডিকেল অফিসার ৮টি। এছাড়া অ-ক্যাডার ও অন্যান্য পদের মধ্যে রয়েছে নার্সিং সুপারভাইজার, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) ২টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি), কম্পিউটার অপারেটর, স্টোর কিপার, ফার্মেসি সহকারী এবং অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক।
এই পদ গুলোতে কাজ করতে হলে অর্থ বিভাগের সম্মতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ কর্তৃক নতুন পদের বেতনস্কেল নির্ধারণ করতে হবে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করতে হবে, স্থায়ী পদগুলোর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ অনুমোদন নিতে হবে এবং কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। এছাড়া অস্থায়ী পদগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জি.ও. জারি করে অর্থ বিভাগের পৃষ্ঠাঙ্কন নিতে হবে। জি.ও. পৃষ্ঠাঙ্কনের তারিখ থেকেই পদগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সৃজিত বলে গণ্য হবে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মকরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে এবং সাবেক মন্ত্রী মরহুম তরিকুল ইসলামের আন্তরিক উদ্যোগে যশোর জেনারেল হাসপাতালের পূর্বপাশে সিসিইউ ভবন নির্মাণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে গত ২০ বছরেও এখানে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর প্যাকেটবন্দী অবস্থায় থেকে নষ্ট হয়ে গেছে, আর হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান নিজের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে নিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রত্যাশা পূরণের পথে এখন আর কোনো বাধা নেই। দ্রুতই হাসপাতালের সিসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হবে।”
যশোর মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিসিইউটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে যশোর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে আর হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী যেতে হবে না। এতে করে যেমন বাঁচবে মহামূল্যবান সময় ও জীবন, তেমনই সাশ্রয় হবে বিপুল অর্থ।
যশোর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. ফারুক এহতেশাম পরাগ বলেন, “এতদিন মানুষ সিসিইউ ভবনটি শুধু বাইরে থেকেই দেখেছে, ভেতরে কোনো সেবা পায়নি। পদ সৃজনের এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন দ্রুতই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত জানান, “এর আগে আগস্টে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩৩টি পদের অনুমোদন দিয়েছিল। অর্থ বিভাগের এই সম্মতি সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, যা যশোর ও পার্শ্ববর্তী জেলার হাজার হাজার হৃদরোগীর জন্য বিশাল স্বস্তি নিয়ে আসবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সিসিইউ চালু করতে ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে যশোর মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কর্যক্রম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলছে সেখানে ধোয়া মুছার কাজ।”
