শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬

টেকনাফে পাহাড় থেকে ৫৬ জন উদ্ধার, নিহত সেনাসদস্যের মরদেহ যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে

কামাল পারভেজ, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

টেকনাফে পাহাড় থেকে ৫৬ জন উদ্ধার, নিহত সেনাসদস্যের মরদেহ যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে

কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে যৌথ বাহিনী। শুক্রবার সকালে তাঁদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। এদিকে মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখের (২৭) মরদেহ শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে ফরিদপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য তিতাস শেখ নিহত হন। এ ঘটনায় মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী এ অভিযান পরিচালনা করে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রথমে ৫৭ জন উদ্ধারের কথা জানানো হলেও পরে যাচাই করে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন দালালও যাত্রী সেজে অবস্থান করছিলেন। অভিযানে আটক পাঁচজনকে পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, তাঁকে আট দিন ধরে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের ইমামুল নামের এক ব্যক্তি তাঁকে ডেকে নিয়ে যান। পরে মোবাইল ফোনসহ সবকিছু কেড়ে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

আসাদুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে গিয়ে তিনি তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পান। তাঁদের পাহারায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল ছিল। দুই দিন আগে তাঁদের কয়েকজনকে ট্রলারে তোলার চেষ্টা করা হলেও জায়গা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার তাঁদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।

উখিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ও মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে মো. নূরালী নামের এক দালাল তাঁদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। পাঁচ দিন ধরে পাহাড়ের ওই আস্তানায় বন্দী ছিলেন তাঁরা। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁদের মারধর করা হয় এবং পরে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাঁদের অভিযোগ, বন্দীদের দিনে দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। বৃহস্পতিবার তাঁদের ট্রলারে তুলে মালয়েশিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা ছিল।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। পাহাড়ে অভিযানের সময় একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দুর্গম পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানব পাচার নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।

নিহত সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা আফজাল হোসেন। তিনি বিবাহিত ছিলেন, তবে তাঁর কোনো সন্তান নেই। পরিবারের সদস্যরা জানান, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিতাস। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

এম/আই

Link copied!