খুলনা মহানগরীতে একের পর এক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে নগরীর খানজাহান আলী রোডের পিটিআই মোড় এলাকায় নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। চাইনিজ কুড়াল নিয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দরজা, কাচ, দুটি এসি ও একটি টেলিভিশন ভাঙচুরের পাশাপাশি প্রায় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রংধনু ক্লিনিক ও আব্দুল্লাহ প্যাথলজিতেও হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রোজী জানান, শনিবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে চার-পাঁচজন যুবক চাইনিজ কুড়াল নিয়ে নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রবেশ করে। কোনো কথা না বলেই তারা ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় প্রতিষ্ঠানের দরজা, কাচ, দুটি এসি ও একটি টেলিভিশন ভাঙচুর করা হয়। পরে হামলাকারীরা প্রায় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। তাদের কাছে পিস্তলও ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাচ ও এসি ভাঙচুর করা অবস্থায় দেখতে পান। পরে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে চার-পাঁচজনকে হামলায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের হাতে চাইনিজ কুড়াল ছিল।
ওসি বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা বলে চাঁদা দাবির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে ফোন করে নূরে আলম নামে একজনকে চেনেন কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। চাঁদা দাবির বিষয়ে মালিক এখনো পুলিশকে কিছু জানাননি।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা আগে একটি দ্রুত বিচার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ওই মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছিল। গত ২৬ অক্টোবর তারা জামিনে বের হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর শামসুর রহমান রোডে রংধনু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আব্দুল্লাহ প্যাথলজিতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীরা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠান চালাতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানের এক নারী কর্মীর ভাষ্য, সন্ধ্যায় প্রথমে পাঁচ থেকে সাতজন ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করেন। বাইরে আরও ১০ থেকে ১২ জন অবস্থান করছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে আরও লোকজন যোগ দেন। একপর্যায়ে হামলাকারীর সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ জনে পৌঁছায়। তারা দরজায় লাথি মেরে ভেতরে ঢুকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করেন।
ওই নারী কর্মী অভিযোগ করেন, এ সময় তার স্বামীকে মারধর করা হলে তিনি বাধা দিতে যান। তখন তাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এতে তার ঠোঁটে আঘাত লাগে। হামলাকারীরা তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং সেখানে আর প্যাথলজির ব্যবসা চালাতে দেওয়া হবে না বলে চলে যান।
তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে খুলনা সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন বলেন, একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট দিতে ৭২ ঘণ্টা দেরি হবে জানানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কিছু লোকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়। তারা লোকজন নিয়ে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। পরে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।
আব্দুল্লাহ প্যাথলজির মালিক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এভাবে চলতে থাকলে তারা কীভাবে রোগীদের সেবা দেবেন।
এর আগে গত ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় নগরীর বাবুখান রোডে সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে সোনাডাঙ্গার মজিদ সরণিতে প্রতিষ্ঠানটির অন্য শাখা সন্ধানী মেডিকেয়ার হাসপাতালেও ভাঙচুর করা হয়। ওই ঘটনায়ও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। তবে এ বিষয়ে মালিকপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর কমার্স কলেজের বিপরীতে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল ক্লিনিকের নিজস্ব ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। প্রথমে প্রফেসর ডা. মো. কুতুবউদ্দিন মল্লিকের চেম্বারের সামনের কাচ ভাঙচুর করে তারা। পরে ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের চেম্বারের সামনের কাচ, ভেতরের চেয়ার-টেবিল এবং ক্যাশ কাউন্টারের কাচ ভাঙচুর করে।
এ সময় চিকিৎসক দুজন আত্মরক্ষার্থে সরে যান। ক্লিনিকের ভেতরে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারীরা বের হওয়ার সময় বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পরে তারা পায়ে হেঁটে বাবুখান রোডের দিকে চলে যায়।
ক্লিনিকের রিপোর্ট প্রদানকারী ইকবাল হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ক্লিনিকের কর্মকর্তা সুরেশ রায় আহত হন।
ক্লিনিকের সুপারভাইজার কল্যাণী বলেন, রাতে স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছিল। সাড়ে ৯টার দিকে মুখোশ পরা কয়েকজন সামনে থেকে ভাঙচুর করতে করতে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে এসে হামলা চালান। এ সময় তারা বাইরে বের হয়ে যান। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর আবার ভেতরে আসেন তারা। তবে হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
ঘটনার পর ক্লিনিকের ভেতরে মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। উপস্থিত কেউ হামলার কারণ সম্পর্কে মুখ খুলতে চাননি। খবর পেয়ে পুলিশ ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। হামলার কারণ ও জড়িতদের সম্পর্কে পুলিশ কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।
এ ছাড়া নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড মোড়ের ঐতিহ্যবাহী চয়নিকা ফার্মেসি চাঁদাবাজির অভিযোগে গত ২৯ অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে।
