দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় অসুখ হলো—কোটি টাকার সরঞ্জাম, অবকাঠামো কিছুদিন যেতে না যেতেই অকেজো হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
অব্যবস্থাপনা নামের এই রোগ নতুন কিছু নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে এমনটি চলে আসছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, কভিড ১৯ মহামারির সময় সরকারি হাসপাতালগুলোয় স্থাপিত নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (আইসিইউ) ও আরটি-পিসিআর ল্যাব এখন অবহেলায় পড়ে রয়েছে। ২০৪টি আইসিইউ এবং ১৪১টি আরটি-পিসিআর ল্যাব তালাবন্দি করে রাখা হয়েছে। অথচ কভিডের সময় গড়ে তোলা সেই সক্ষমতা ধরে রাখা গেলে এখন অনেকেই জীবন রক্ষাকারী সেবা গ্রহণ করতে পারত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ওই সময় নিয়োগ দেওয়া চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। মূলত জনবলসংকটের কারণেই দেশের অন্তত ২৫টি সরকারি হাসপাতালে দুই শতাধিক আইসিইউ শয্যা বর্তমানে পুরোপুরি অকার্যকর বা সীমিত কলেবরে চলছে। অন্যদিকে কভিডকালে স্থাপন করা ১৬২টি আরটি-পিসিআর ল্যাবের মধ্যে ১৪১টিই বর্তমানে অকার্যকর। এ ক্ষেত্রে জনবল নেই ও রি-এজেন্ট সংকটের কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আইসিইউ এবং পিসিআর ল্যাব শুধু কভিড মোকাবেলার জন্য নয়—অন্যান্য সংক্রামক রোগ শনাক্ত, জটিল রোগীর চিকিৎসা কিংবা হাম-ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগত কারণে প্রশ্ন আসে, এসব মূল্যবান সরঞ্জাম কি কোনোভাবে মানুষের সেবার কাজে লাগানো যেত না? এখনো কত মানুষ একটি আইসিইউ শয্যার জন্য ছোটাছুটি করেন, তাহলে কেন আইসিইউ তালাবন্দি থাকবে?
এদিকে দেশে এখনো হামের মতো রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে বেশি।
চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, ঝালকাঠি নতুন হটস্পটে পরিণত হয়েছে। সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এসব স্থানে স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম। আর আমাদের বাস্তবতা হলো, রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা নেই। অনেক জায়গায় হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই। আবার চিকিৎসক থাকলেও জরুরি ওষুধপত্র নেই।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ যথার্থই বলেছেন, ‘বিপদের সময়ে আইসিইউ ও পিসিআর ল্যাবের যে বিপুল সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, জরুরি প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর তা ধরে রাখতে না পারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বড় ঘাটতি। এসব সুবিধাকে পরবর্তী সময়ে কিভাবে বিকল্প কাজে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে কোনো রিভিউ কমিটি করা হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তারও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে গতকালও এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা প্রদান করবেন।’
আমরা মনে করি, দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশা কাটাতে টেকসই ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে সঠিক ও জনবান্ধব পরিকল্পনা নিতে হবে। মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি। আমাদের মতো টানাপোড়েনের দেশে যেকোনো আর্থিক অপচয় কঠোরভাবে রোধ করতে হবে।
