নিবন্ধিত দলিলের সম্পাদন অস্বীকার করলেই তা বাতিলযোগ্য হয়ে যায় না; বরং দলিলটি যথাযথভাবে সম্পাদন ও নিবন্ধিত হয়নি— এমন দাবির সমর্থনে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। তবে নিবন্ধনের নিয়মিততা সম্পর্কে আইনে যে অনুমান রয়েছে- তা চূড়ান্ত নয়, উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে সেই অনুমান খণ্ডন করা সম্ভব।
এক বৃদ্ধা মায়ের করা হেবা দলিল বাতিলের মামলা খারিজের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিভিশন আবেদন খারিজ করে এ আইনি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর একক বেঞ্চ মো. ইব্রাহিম ও অন্যান্য বনাম মো. ফজলুর রহমান মামলায় গত ২৮ জুলাই এ রায় দেন। সিভিল রিভিশন নম্বর ৮৫৪/২০২৪ মামলাটির রায় গত ১৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।
মামলার বাদী মোছা. আয়জান বিবি ছিলেন বিবাদী মো. ফজলুর রহমানের মা। বাদীর অভিযোগ, ৮৫ বছর বয়সে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর তার অজ্ঞাতে বিভিন্ন কাগজে টিপসই নেওয়া হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, ২০১০ সালের ২৫ জুলাই সম্পাদিত ৬৮৯৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার ৭৭ শতাংশ জমি ছেলের নামে হেবা করা হয়েছে।
বাদীর দাবি ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় ওই জমি হেবা করেননি এবং দলিলটির বিষয়বস্তু সম্পর্কেও অবগত ছিলেন না। এ কারণে দলিলটি বাতিল চেয়ে ২০১১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন তিনি।
ভুয়া মামলা দিয়ে শতাধিক মানুষকে হয়রানি করায় বিচারক বরখাস্ত
অন্যদিকে, বিবাদীর বক্তব্য ছিল, তার মা সুস্থ ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অবস্থায় দলিলটি সম্পাদন ও নিবন্ধন করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট জমির দখলও তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
বিচারিক আদালত ২০২২ সালের ৩১ মে মামলাটি খারিজ করেন। পরে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর অতিরিক্ত জেলা জজ, নওগাঁ আপিলেও ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়।
হাইকোর্ট মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখেন, বাদী জীবদ্দশায় বিভিন্ন সময়ে অন্য সন্তান ও তৃতীয় পক্ষের অনুকূলে একাধিক জমির দলিল সম্পাদন করেছিলেন। বিতর্কিত হেবা দলিলের পরও তিনি অন্য দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করেন। এসব দলিলের সম্পাদন ও নিবন্ধন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আপত্তি ছিল না।
আদালত আরও দেখতে পান, বিতর্কিত দলিলের লেখক সাক্ষ্যে বলেছেন, তিনি বাদীকে দলিলটি পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং এরপর বাদী তাতে টিপসই দেন। দলিল শনাক্তকারী সাক্ষীও নিবন্ধনের সময় বাদীকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছেন।
এসব সাক্ষ্যের বিপরীতে বাদী এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে বিতর্কিত দলিলে অথবা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের টিপসই রেজিস্টারে থাকা টিপসই তার নয়। ফলে কেবল দলিল সম্পাদনের বিষয়টি অস্বীকার করার ভিত্তিতে দলিলটি বাতিলের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালত মত দেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান / উবাইদুলের গোড়ালিতে কোপ দিয়ে পায়ের রগ কেটে দেয়: জবানবন্দিতে সাক্ষী
রায়ে নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৬০ ধারার তাৎপর্য তুলে ধরেন হাইকোর্ট। এ ধারার অধীনে নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হলে দলিলটি আইনের নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে বলে একটি অনুমান সৃষ্টি হয়। তবে এ অনুমান চূড়ান্ত বা অকাট্য নয়। উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে নিবন্ধনের নিয়মিততা সম্পর্কে সৃষ্ট অনুমান খণ্ডন করা যেতে পারে।
আইনি দৃষ্টিতে নিবন্ধন সনদের গুরুত্ব হলো, এটি দলিলের নিবন্ধন-সংক্রান্ত নিয়মিততার পক্ষে প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু কোনো দলিলের সম্পাদন নিয়ে নির্দিষ্ট বিরোধ দেখা দিলে আদালত সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্য, দলিলের লেখক ও শনাক্তকারী সাক্ষীর বক্তব্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিবেচনা করতে পারেন।
ফলে নিবন্ধিত দলিল জাল বা প্রতারণার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে— এমন অভিযোগ উত্থাপন করলেই আদালত তা বাতিল করবেন, এমন নয়। অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। একই সঙ্গে যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করা গেলে নিবন্ধন-সংক্রান্ত আইনগত অনুমানও খণ্ডনযোগ্য।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিচারিক আদালত ও আপিল আদালত উভয়েই মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ভুলভাবে পাঠ করা হয়েছে বা বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে— এমন কোনো ভিত্তিও রিভিশন আবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
