আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা হয়নি এখনো। তারপরও ‘একক প্রার্থী’ বাছাইয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও এরই মধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ঠিক করা হয়েছে চারটি মানদণ্ড। ক্লিন ইমেজ, জনপ্রিয়, দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদান এবং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা—এ চার মানদণ্ডের আলোকে প্রার্থী বাছাই করতে পাঁচ বিভাগের মহানগর, জেলা-উপজেলা ও পৌরসভার নেতাদের ‘জুম মিটিং’-এর মাধ্যমে নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছেন দায়িত্বশীল নেতারা। একই সঙ্গে দলের বাইরেও এলাকায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি যদি থাকেন, তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাকে সমর্থন দিলেও আপত্তি নেই বলেও তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের বার্তা দিয়েছে বিএনপি।
দলীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও সমন্বিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় চার সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসমাঈল জবিউল্লাহ ও বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা (মীরদা)। আগামী দিনে এ কমিটির আকার আরও বাড়তে পারে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি গুলশানে অফিসে বসে কমিটির সদস্যরা মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে ‘জুম মিটিং’ করে নানা দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির প্রকৃত অবস্থানের খোঁজখবর নিয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নানা নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূলের নেতাদের মতামতও শুনছেন তারা। শিগগির বাকি বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও জুম মিটিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থন ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। জনগণের সঙ্গে প্রার্থীদের সম্পৃক্ততা, স্থানীয় পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী বাছাই করা হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা সবকিছু যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশের প্রতিটি এলাকায় দলীয় সমর্থনের প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে বিকল্প প্রার্থী রাখার প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপিতে। বিশেষ করে কোনো কারণে কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল, অযোগ্যতা বা অন্য কোনো জটিলতার আশঙ্কা থাকলে একই এলাকায় একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার চিন্তা রয়েছে দলটির। যাচাই-বাছাই শেষে মূল প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে পরবর্তী সময়ে বিকল্প প্রার্থী তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। মূল লক্ষ্য, কোনো এলাকায় যেন শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর শূন্যতা তৈরি না হয়।
এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ওই নির্বাচনে ঝুঁকি এড়াতে জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিনের পাশাপাশি দলের আরেক সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে মাসুদ তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো এলাকায় প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা থাকলে একই ধরনের কৌশল অবলম্বনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির নেতাদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, ‘বিকল্প প্রার্থী রাখা স্বাভাবিক গঠনমূলক রাজনৈতিক কৌশল। এটার মধ্যে অন্য কোনো অভিপ্রায় নেই। স্বাধীন নির্বাচনে কমিশনের সিদ্ধান্তে যদি কোনো কারণে একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সেখানে বিকল্প প্রার্থী দিতে হবে। এজন্য কোথাও কোথাও একাধিক প্রার্থী রাখা হতে পারে। মূলত প্রতিটি এলাকায় প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে এ কৌশল নেওয়া হবে।’
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সিনিয়র চার সদস্যকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি যতটুকু জানি, তারা এরই মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, বরিশালসহ কয়েকটি বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দলীয় ভাবে প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।’
দলীয় সূত্রমতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চারটি বিভাগের জেলা-উপজেলা ও পৌরসভায় নেতাদের জুম মিটিংয়ে এ বিষয়ে আগাম নির্দেশনা দেওয়া হয়। দলের পক্ষ থেকে এটিকে মূলত একটি ‘প্রাথমিক সতর্কবার্তা’ বা ‘প্রিলিমিনারি অ্যালার্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাই করার ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সম্ভাব্য সব বিষয় মাথায় রেখেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতাদের সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রার্থী বাছাই করে জেলার নেতাদের কাছে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো কারণে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে বিভাগীয় টিম বা কেন্দ্রীয় বিএনপিকে জানাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জুম মিটিংয়ে।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রথমে উপজেলা বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম জেলা কমিটির কাছে সুপারিশ করবে। প্রার্থী বাছাই ঠিক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে জেলা কমিটি। সেই সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে বিভাগীয় টিমের কাছে পাঠাবে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে তা বিভাগীয় টিম পরবর্তী পর্যায়ে তা পর্যালোচনা করবে। আবার বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো জটিলতা থাকলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তারা তা সমাধান করবেন। অর্থাৎ প্রার্থী বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম বা ভুলের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিটি এলাকায় দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি।
বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল) আকন কুদ্দুসর রহমান কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে ভালো ফল করার জন্য জুম মিটিংয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। যারা অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজ ও জনপ্রিয়, তাদের প্রার্থী করার জন্য স্থানীয় নেতাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন সামনে রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে, সুশৃঙ্খল থাকতে হবে, কোনো অন্যায় কাজে জড়ানো যাবে না। অন্যায় কাজে জড়ালে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, জুম মিটিংয়ে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছেন। তাদের বলা হয়েছে, নির্বাচনে দলীয় কোনো মনোনয়ন বোর্ড থাকবে না। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই ও সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেবেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়াসহ নানা নির্দেশনা দিয়েছে। দলের সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে বলেছেন দায়িত্বশীল নেতারা। তিনি বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যেন কোনো কর্মসূচি করতে না পারে, এজন্য মাঠে মিছিল সমাবেশসহ কর্মসূচি নিয়ে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
জুম মিটিংয়ের পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় নির্বাচনে দলের সমর্থিত প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে আনোয়ারা, সাতকানিয়া, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলাভিত্তিক একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি। কমিটিগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ এবং সাধারণ জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সরাসরি মতামত নিয়ে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে গোপনীয় প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনার পর সমন্বিত উদ্যোগ ও আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান কালবেলাকে বলেন, জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচনে জেলা ও উপজেলা নেতাদের প্রার্থী বাছাইয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অবশ্যই দলের ত্যাগী, যোগ্য ও বিজয়ী হওয়ার মতো ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে বাছাই করতে হবে। কোনো প্রার্থীর দলের জন্য ত্যাগ কম; কিন্তু এলাকায় বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাকেও বিবেচনা নিতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, এলাকায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা বেশি রয়েছে, বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাকেও প্রার্থী করা যেতে পারে। সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন, তাকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
