ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না কারও। একসময় নিজেও হয়তো ভাবতে পারেননি, পৌঁছাবেন এতটা উচ্চতায়।
তবে কঠোর পরিশ্রম আর নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে একটু একটু করে এগিয়েছেন হ্যারি কেইন। দীর্ঘ পথচলায় পার করেছেন অনেক চড়াই-উতরাই।
অবশেষে তার হাতেই উঠল ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। স্বপ্নের এই অর্জনের পর ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার ফিরে তাকালেন নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর দিকে।
লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে সোমবার রাতে ব্যালন ডি’অর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে সেরার স্বীকৃতি পান কেইন। ২৫ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার জেতেন বায়ার্ন মিউনিখের তারকা।
গত মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন কেইন। তার নৈপুণ্যে বুন্ডেসলিগার শিরোপা ধরে রাখে জার্মান ক্লাবটি। এরপর বিশ্বকাপে ছয় গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমি-ফাইনালে তুলতেও বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
এমন দুর্দান্ত এক মৌসুমের পর ব্যালন ডি’অর জিতে সামাজিক মাধ্যম এক্সে সংক্ষিপ্ত বার্তায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন কেইন, ‘নীরবে কঠোর পরিশ্রম করো। তোমার সাফল্যই তোমার হয়ে কথা বলুক।’
অনুষ্ঠানের পর ডিএজেডএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ পথচলা নিয়ে কথা বলেন ৩৩ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড। জানালেন, এত বড় সাফল্যের কথা একটা সময় তার নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হতো।
‘অনেকেই হয়তো এমনটা ভাবেননি, এমনকি আমিও হয়তো ভাবিনি। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। এখনকার কিছু ফুটবলারের মতো আমাকে কখনও এমন একজন হিসেবে দেখা হয়নি, যে ভবিষ্যতে সুপারস্টার হবে। আমাকে নিজের সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।’
শুরুর সেই কঠিন সময়গুলোতে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে কেইনকে। তবে কখনও আত্মবিশ্বাস হারাননি তিনি।
‘অনেক সময় নিজের মনের সঙ্গেই আমাকে লড়তে হয়েছে এবং সেসব বাধা পেরিয়ে আসতে হয়েছে। নিজের ওপর বিশ্বাস ও দৃঢ়তা দেখাতে হয়েছে। আমার মনে হয়, এসবই আমাকে শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছে।’
একের পর এক গোল আর সাফল্যের পরও নিজেকে আরও ভালো করার তাড়না কখনও কমেনি কেইনের। ব্যালন ডি’অর জিতেও সেই মানসিকতা ধরে রাখতে চান তিনি।
‘আমি নিজেকে বলেছিলাম, যা-ই অর্জন করি না কেন, যত গোলই করি কিংবা ব্যালন ডি’অর জিতি, সব সময় লক্ষ্য থাকবে নিজেকে আরও ভালো করা। এই পুরস্কার সেটারই প্রমাণ। বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি। সত্যি বলতে, ভাষা হারিয়ে ফেলেছি প্রায়।’
কেইনের এই সাফল্যের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। টটেনহ্যাম হটস্পারের মূল দলে জায়গা পাকা করার আগে ধারে খেলতে হয়েছে লেটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়াল, নরউইচ সিটি ও লেস্টার সিটির হয়ে।
এরপর ধীরে ধীরে টটেনহ্যামের আক্রমণভাগের মূল ভরসা হয়ে ওঠেন তিনি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে।
প্রায় দুই দশক টটেনহ্যামের সঙ্গে সম্পর্কের পর ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন কেইন। জার্মান ক্লাবটির হয়ে এরই মধ্যে দুটি বুন্ডেসলিগা শিরোপা জিতেছেন তিনি। জার্মানিতে নিজের প্রথম তিন মৌসুমের প্রতিটিতেই হয়েছেন লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
এবার ব্যালন ডি’অর জিতে ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসেও বিশেষ জায়গা করে নিলেন কেইন। দেশটির পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার জিতলেন তিনি।
১৯৫৬ সালে প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জেতেন স্ট্যানলি ম্যাথিউস। এরপর ১৯৬৬ সালে ববি চার্লটন, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে কেভিন কিগান এবং ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েন পান এই সম্মাননা।
নিজের দেশের মাটিতে পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠার সময় দর্শকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পান কেইন। আবেগাপ্লুত ইংল্যান্ড অধিনায়ক কৃতজ্ঞতা জানান ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে পাশে থাকা কোচ, সতীর্থ ও পরিবারের সদস্যদের।
‘যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। আমি বুঝতে পারছি, এবার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কত কঠিন ছিল। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অসাধারণ সব ফুটবলার ছিলেন। তাদের কেউ কেউ আমার সতীর্থ, আবার অনেক বিশ্বমানের ফুটবলারও আজ এখানে উপস্থিত আছেন।’
চূড়ান্ত ভোটে কেইনের পরে দ্বিতীয় হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে। তৃতীয় স্থানে বার্সেলোনা ও স্পেনের তরুণ তারকা ইয়ামাল।
গত মৌসুমের দুর্দান্ত ছন্দ নতুন মৌসুমেও ধরে রেখেছেন কেইন। ২০২৬-২৭ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১২ ম্যাচে করেছেন ১০ গোল। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের তিন ম্যাচেই চারবার জালের দেখা পেয়েছেন তিনি।
ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলেও একের পর এক কীর্তি গড়ে চলেছেন এই ফরোয়ার্ড। চলতি মাসের শুরুতে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ১২৫ ম্যাচ খেলার পিটার শিলটনের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন কেইন। আগামী আন্তর্জাতিক বিরতিতেই সাবেক এই গোলরক্ষককে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তার।
ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও কেইন। জাতীয় দলের হয়ে তার গোল ৯১টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ওয়েইন রুনির চেয়ে ৩৮ গোল বেশি করেছেন তিনি।
