সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
অংশ নিলেন ৫০ সাংবাদিক

চট্টগ্রামে সংবেদনশীল সাংবাদিকতা চর্চায় বিভাগীয় সংলাপ

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম

চট্টগ্রামে সংবেদনশীল সাংবাদিকতা চর্চায় বিভাগীয় সংলাপ

সংবাদ পরিবেশনে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করা, সামাজিক বৈষম্য ও নেতিবাচক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব জোরদারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে "সংবেদনশীল সাংবাদিকতা" সংলাপ ও করণীয়’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপ। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন।
রোববার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এ সংলাপের যৌথ আয়োজক ছিল প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব। সংলাপে সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সংবাদ পরিবেশনে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীল ভাষার ব্যবহার এবং গণমাধ্যমে প্রচলিত জেন্ডারগত স্টেরিওটাইপ দূর করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রতিবন্ধকতা ও কার্যকর সাংবাদিকতার চর্চা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সংবাদে নিরপেক্ষতা, জেন্ডার-সংবেদনশীলতা এবং সব মানুষের মর্যাদা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষই সমাজের প্রহরী হলেও সাংবাদিকদের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকেরা ইতিহাসের অংশ নির্মাণ করেন। সংবাদে ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে পারে। এ কারণে সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রকাশের প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের যথার্থতা, দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সংবাদে ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানোর পরিবর্তে তাঁদের চরিত্র ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরনের চর্চা পরিহার করে পক্ষপাতমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহীন নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় তরুণদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সংবাদ ও গল্প উপস্থাপনের ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা গেলে ক্ষতিকর সামাজিক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করা এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ আরও সুগম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সাংবাদিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি বলেন, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত উৎকর্ষের সঙ্গে সংবেদনশীলতা এবং দায়িত্বশীলতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা বিস্তারে নিয়মিত আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংলাপে সাংবাদিকতায় জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিষয়ক ব্যবহারিক নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা পরিচালনা করেন পিআইবির সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন। তিনি বলেন, জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা কেবল নারী বা কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ নয়; বরং সব মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিচয় ও মর্যাদাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। সংবাদ সংগ্রহ, ভাষা, ছবি, শিরোনাম, তথ্যসূত্র নির্বাচন ও সংবাদ উপস্থাপনের প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি। এ নির্দেশিকা সাংবাদিকদের দৈনন্দিন পেশাগত কাজে সংবেদনশীলতার চর্চা আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ নোমান। এতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম অংশীদার জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের বিভাগীয় সমন্বয়ক সুজয় বড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন ম্যানেজার হুসাইন শাকির, মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ মো. তাফহিম এবং জেন্ডার স্পেশালিস্ট ফারজানা রূপা।
চার বছর মেয়াদি ‘সমতায় তারুণ্য‍‍` ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ প্রকল্পটি নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট যৌথভাবে প্রকল্পটি পরিচালনা করছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য, বাংলাদেশের আটটি বিভাগের বিভিন্ন বৈচিত্র্যের তরুণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীরা, যেন সহিংসতামুক্ত জীবনযাপন করতে পারে, নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং পরিবার, সম্প্রদায়, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেন্ডারগত নেতিবাচক ধ্যানধারণা চ্যালেঞ্জ করতে উদ্যোগী হতে পারে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, চট্টগ্রামের এ সংলাপ সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক শেখা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার চর্চা বিস্তারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ধারাবাহিক বিভাগীয় সংলাপের মাধ্যমে দেশের গণমাধ্যমে আরও দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সংবাদচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের বৃহত্তর লক্ষ্য।

 


 

জে/এইচ

Link copied!