বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
গাছতলায় থাকছেন ৯৫ বছরের বৃদ্ধ

সম্পত্তি লিখে নিয়ে বাবাকে তাড়িয়ে দিলো সন্তানেরা!

মুক্তবাণী রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

সম্পত্তি লিখে নিয়ে বাবাকে তাড়িয়ে দিলো সন্তানেরা!

জীবনের দীর্ঘ ৯৫টি বসন্ত পার করে দিয়েছেন হাজী শামসুল হক মোল্লা। তিল তিল করে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মানুষ করেছিলেন ছয় সন্তানকে। অথচ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে সেই সন্তানদের কারো কাছেই একটু ঠাঁই হলো না তাঁর। সব সম্পত্তি লিখে নেয়ার পর এই বয়োবৃদ্ধ পিতার শেষ ঠিকানা হয়েছে বাড়ির পাশের একটি গাছতলা!

হৃদয়বিদারক এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে ৯৫ বছর বয়সী অসহায় এই বৃদ্ধ আজ আপনজনদের নির্মম আচরণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামসুল হক মোল্লার দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। মেয়েদের মধ্যে তিন জন বিবাহিত (মায়া বেগম, সাবিনা বেগম ও সালমা বেগম) এবং ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী।

কয়েক বছর আগে নিজের কিছু জমি বিক্রি করে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়েছিলেন শামসুল হক। এরপর অবশিষ্ট জমিজমা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন তিনি। কিন্তু সম্পত্তি লিখে নেয়ার পর থেকেই বিপত্নীক এই বৃদ্ধের খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দেয় সন্তানেরা।

গত কয়েক দিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে থাকলেও মঙ্গলবার সকালে মায়া বেগম তাঁর বাবাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দুই ভাই ও তাঁদের স্ত্রীরা মিলে বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে ফেলে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ৯৫ বছরের এক বৃদ্ধ বাবার প্রতি সন্তানদের এমন অমানবিক আচরণে পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

বয়োবৃদ্ধ বাবাকে ঘরে রাখতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বড় মেয়ে মায়া বেগম বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। তার ওপর আমার বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলী থাকে। যার কারণে আমার পক্ষে বাবাকে রাখা সম্ভব নয়। মেঝ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, আমাদের চার বোনকে জমি বিক্রি করে মাত্র চার লাখ টাকা করে দিয়েছে। বাবা দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ ৮ কাঠা করে জমি দিয়েছে। এখন আমরা বোনেরা কেন বাবার দেখাশোনা করব?

এদিকে অভিযুক্ত দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পাওয়া যায়নি এবং তাঁদের স্ত্রীরাও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে প্রতিবেশীদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহিণীর কণ্ঠে ঝরে পড়ে আক্ষেপ, শামসুল হক মোল্লার সব সম্পত্তি লিখে নিয়ে এখন তাঁর সন্তানেরা তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি সন্তানদের জমি লিখে না দিতেন, তবে হয়তো এই দশা হতো না। সন্তানরা যা করছেন, তা কোনোভাবেই কোনো পিতার জন্য কাম্য নয়।”

চোখের জল মুছতে মুছতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে অসহায় শামসুল হক বলেন, আমি এখন কোথায় যাবো? কী করব? কিছুই বুঝতে পারছি না। সারাজীবন কষ্ট করে যাদের বড় করলাম, আজ তারাই আমাকে বোঝা বানিয়ে দিল।

এই অমানবিক ঘটনার খবর জানার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফ-উল-আরেফীন। তিনি বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। আমি নিজেই ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। শামসুল হক সাহেবের সন্তানেরা যদি তাঁর দেখাশোনা না করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ’ আইন অনুসারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইন বা প্রশাসন হয়তো শেষ পর্যন্ত এই অসহায় পিতার আশ্রয় নিশ্চিত করবে, কিন্তু জন্মদাতা পিতার প্রতি সন্তানদের এই নির্মম রূপ সমাজকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

এম/আর

Link copied!