একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল পাট। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে পাটের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। নানা অব্যবস্থাপনা, লোকসান, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা ও বাজার সংকটে সেই সোনালি আঁশের গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘদিন পর বন্ধ পাটকলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। ইতোমধ্যে লিজ দেওয়া ১৭টি মিলের ৯টিতে উৎপাদন শুরু এবং প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া এ সম্ভাবনারই বাস্তব প্রমাণ।
আরও তিনটি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের যে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা শুধু একটি শিল্প খাতের পুনরুজ্জীবন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হবে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও রপ্তানি খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষ। সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল, খুলনার স্টার জুট মিল ও প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলকে ঘিরে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনাও অর্থনীতিতে নতুন গতিসঞ্চারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো দীর্ঘদিন লোকসানে থাকার অন্যতম কারণ ছিল দুর্বল ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতার ঘাটতি, পুরনো যন্ত্রপাতি, অনিয়ম এবং বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা। শুধু মালিকানা পরিবর্তন করে এসব সমস্যা দূর করা যাবে না। নতুন ব্যবস্থাপনায় মিলগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক ও লাভজনক করতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত পণ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের সম্ভাবনা তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু কাঁচা পাট বা প্রচলিত পাটজাত পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। পাট থেকে বহুমুখী ও মূল্য সংযোজিত পণ্য— ব্যাগ, জিও টেক্সটাইল, ফার্নিচার, গৃহসজ্জার সামগ্রী, ফ্যাশনপণ্যসহ আধুনিক শিল্পপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে পাটচাষিদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে কাঁচামালের চাহিদা বাড়লে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাটের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে একটি কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানা চালু রেখে নিয়মিত গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করলে বড় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তর বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পর শর্ত ভঙ্গের ঘটনাও ঘটেছে। তাই বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা যাচাই, নির্ধারিত বিনিয়োগ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়মিত তদারক করতে হবে। শর্ত ভঙ্গ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোনোভাবেই যেন বছরের পর বছর মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সম্পদ পড়ে না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
পাটশিল্পের সম্ভাবনা শুধু বন্ধ কারখানার চাকা ঘোরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হতে পারে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বিমানবন্দর ও বিদেশি মিশনে পাটপণ্যের প্রদর্শনী, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ এবং বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অতএব, বন্ধ পাটকল চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। স্বচ্ছ লিজ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ— এই ছয়টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই নতুন করে ঘুরতে থাকা পাটকলের চাকা টেকসই হবে এবং হারানো ‘সোনালি আঁশ’ আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
