শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে নতুন উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে নতুন উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের পর ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, উভয় দলের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলের ডানপন্থী সংবাদপত্র ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’-এর এক বিশিষ্ট সাংবাদিক লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতির কারণেই ইসরায়েল এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।

নির্বাচনের ফলের জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতারাও। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের কাছেই নেতানিয়াহু ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। মার্কিন নির্বাচনে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
এদিকে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ধারণা করা হয়, নেতানিয়াহুর উৎসাহেই তিনি এই যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ভোটারদের দল ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন রিপাবলিকান দলের জন্যও রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ইয়াকভ কাটজ বলেন, শুধু ডেমোক্র্যাটরাই নয়, রিপাবলিকান ভোটারদেরও একটি অংশ ইসরায়েল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন চায়। তবে এর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা ইসরায়েল এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।

মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতপার্থক্য এবং ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। তবে এত কিছুর পরও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পেয়ে আসছিল।
নেতানিয়াহু বরাবরই ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি একে ‘প্রকৃত বন্ধুত্ব’ ও ‘অটল সমর্থন’ বলে বর্ণনা করেছেন।

মাত্র ৯ মাস আগেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেনারা একসঙ্গে লড়াই করেছে। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর নজিরবিহীন সমন্বয় তখন নিয়মিত আলোচনার বিষয় ছিল।

তাই সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ইসরায়েলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। তিনি পরিকল্পিত সময়ের দুই বছর আগেই ইসরায়েলকে দেওয়া ৩৮০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করার কথা বলেছেন। তবে ইসরায়েলের উদ্বেগ শুধু এই সহায়তা বন্ধের বিষয়টি নিয়ে নয়, বরং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশটির কূটনৈতিক গুরুত্ব ও অবস্থান কতটা বদলে যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণাকে ‘বজ্রপাতের মতো আকস্মিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঘোষণার দুই দিন পরও কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিলেন না, ট্রাম্পের বক্তব্যটি কতটা গুরুতর।

এর কয়েক দিন পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, মার্কিন সহায়তার পরিবর্তে দুই দেশের অংশীদারত্ব জোরদার করার এই উদ্যোগ তাদের সম্পর্কের শক্তি ও গভীরতার প্রমাণ। তবে ইসরায়েলের বার্ষিক সামরিক বাজেটের ১০ শতাংশেরও কম আসে মার্কিন সহায়তা থেকে।

বিশ্লেষক ইয়াকভ কাটজের মতে, সহায়তা বন্ধের ঘোষণার চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো ভবিষ্যতে অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক অর্থায়ন ও যৌথ প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এসব কার্যক্রম বিলম্বিত বা স্থগিত করতে পারেন।

কাটজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর ইসরায়েল ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব সরবরাহে ধীরগতি দেখা দিলে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরো মনে করেন, নির্বাচনের পর গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে করা কোনো চুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না করার শর্তও দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে কিছু পরিবর্তন আসবে।

ওয়াশিংটন এখন প্রয়োজন অনুযায়ী ইসরায়েলের সমালোচনা করতে আরো বেশি আগ্রহী হতে পারে। তবে দুই দেশের মূল সম্পর্ক অটুট থাকবে। ইসরায়েলি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এখনো বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। অন্য দেশগুলোর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ‘অযৌক্তিক’ ও হিতে বিপরীত বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, আগামী দুই বছর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকবেন। এ সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার কারণে ইসরায়েল সুবিধা পেতে পারে। অতীতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন প্রস্তাব আটকে দিতে ওয়াশিংটন এই ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।

তবে ড্যানন সতর্ক করে বলেন, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের মধ্যেও ইসরায়েলের সমালোচনা বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট বলেছেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করা হবে। অন্যদিকে ইয়ার লাপিদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, দুই দলের সঙ্গেই সমান সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। তার মতে, নেতানিয়াহুর কারণে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় সমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০১৫ সালে মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্টকে উপেক্ষা করে রিপাবলিকানদের ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। ঘটনাটিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়। এর পর থেকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের আরো ঘনিষ্ঠ করেছেন।

এক মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু তার দুই কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারতেন। তবে এখন বিষয়টি আরো বড় রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৌঁছেছে। ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পরিবর্তিত সম্পর্ক কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অভিজ্ঞতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডানপন্থী সংবাদপত্র ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর এক মতামত লেখকও বলেছেন, ইসরায়েলের পক্ষে অন্তহীন রাজনৈতিক বিরোধ ও নির্বাচনী প্রচারণায় জড়িয়ে থাকার সুযোগ নেই। তবে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী যিনিই হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাঁকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপেরও প্রত্যাশা পূরণ করতে হতে পারে।

জেএইচ

Link copied!