শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের জরুরি সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের জরুরি সতর্কবার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ‘এটাই সত্যের মুহূর্ত’। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

সোমবার (৯ নভেম্বর) তুরস্কে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে এ বার্তা দেন গুতেরেস। ৯ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এ সম্মেলন।

চলতি বছরের শেষ দিকে জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে তার দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের প্রতি এটিই তার শেষ বড় আন্তর্জাতিক আহ্বান।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, ‘আমরা আর অপেক্ষা করতে পারি না। এমন অন্তহীন আলোচনা আর চলতে পারে না, যেখানে প্রত্যেকে দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সবাইকে আরও বেশি করতে হবে, এবং তা এখনই করতে হবে।’

গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা তুলে ধরতে বারবার সতর্ক করেছেন গুতেরেস। ২০২৩ সালে তিনি বলেছিলেন, বিশ্ব এখন ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ থেকে ‘বৈশ্বিক স্ফুটন’-এর যুগে প্রবেশ করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এ মন্তব্য করেন।

১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার লক্ষ্য নিয়ে হতাশা

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজের জীবনের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতার কথাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন গুতেরেস।

তিনি জানান, গত বছর জলবায়ু বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেওয়ার আগে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মূল লক্ষ্য; প্রাক্‌-শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা, এখনও অর্জন সম্ভব বলে তিনি বলতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাকে জানান, সেই দাবি আর বাস্তবসম্মত নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে ইতোমধ্যে বিপুল কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে।

গুতেরেস বলেন, ‘এটি আমার জন্য ছিল বিশাল এক ধাক্কা।’

তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন লক্ষ্য হচ্ছে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলেও তা যতটা সম্ভব কম রাখা।

তবে এই ব্যর্থতার জন্য তিনি বিশ্ববাসীকে দায়ী করেননি। তার মতে, ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

গুতেরেস বলেন, পৃথিবীকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ঘনঘন নীতি পরিবর্তনের কারণে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আশার আলো

পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের বৈশ্বিক সম্প্রসারণও তাকে আশাবাদী করছে। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এসব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্রমেই সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠছে।

তবে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারসহ একাধিক বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গুতেরেস বলেন, এআই ব্যবস্থার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হচ্ছে, পাশাপাশি এর কার্বন নিঃসরণও উদ্বেগের বিষয়।

তার মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার নিরাপত্তাঝুঁকিও সামনে নিয়ে এসেছে।

নেপালে বিপর্যয়ের আগাম সতর্কতা দিয়েছিলেন

২০২৩ সালে নেপালের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলো সফর করে হিমবাহ গলে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন গুতেরেস।

তখন তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, হিমবাহ গলে সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে।

সফরকালে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ছাদ থেকে আজ আমি চিৎকার করে বলতে এসেছি, এই উন্মাদনা বন্ধ করুন। হিমবাহ পিছু হটছে, কিন্তু আমরা পিছু হটতে পারি না। জীবাশ্ম জ্বালানির যুগের অবসান ঘটাতে হবে।’

সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, আশঙ্কা করা বিপর্যয়গুলো তার ধারণার চেয়েও দ্রুত ঘটেছে। গত আগস্টে বন্যায় এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং আরও প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ জন নিখোঁজ হন। বিজ্ঞানীরা এসব বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকার কথা জানিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানান তিনি। তার মতে, যারা জলবায়ু সংকট সৃষ্টির জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

গুতেরেস বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। এসব অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর আরোপ করে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া উচিত।

জলবায়ু আন্দোলনে প্রশংসিত গুতেরেস

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুতেরেসের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর।

তিনি বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুতেরেস ধারাবাহিকভাবে স্পষ্ট, জোরালো ও যথাযথ বক্তব্য দিয়েছেন। মানবজাতির সামনে এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এটি তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছেন।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আলোচনায় সভাপতিত্ব করা ইউরোপিয়ান ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লরেন্স তুবিয়ানাও তার ভূমিকার প্রশংসা করেন।

তুবিয়ানার মতে, জাতিসংঘের আগের যে কোনো মহাসচিবের তুলনায় গুতেরেস জলবায়ু ইস্যুতে অনেক বেশি দূর এগিয়ে গেছেন।

তবে জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন গুতেরেস। তিনি বলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের আহ্বান মানতে বাধ্য নয়। আবার নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতাও রয়েছে।

গুতেরেসের ভাষায়, ‘মহাসচিব হিসেবে আমার প্রকৃত ক্ষমতা খুবই সীমিত। আমাদের তেমন অর্থও নেই। তবে আমাদের একটি জিনিস আছে, সেটি হলো কণ্ঠস্বর।’

তার উত্তরসূরির জন্য তিন শব্দের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি, ‘সত্য কথা বলুন।’

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখনও পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে গুতেরেসের শেষ বার্তা, ‘এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিন। কারণ এটি আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আর প্রথম যে বিষয়টির জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে, তা হলো নিজেদের জীবন রক্ষা।’

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!