বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

তাহসিফের শেষ রাতে মাজার বস্তিতে ছিল পুলিশের টাইগার টিম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

তাহসিফের শেষ রাতে মাজার বস্তিতে ছিল পুলিশের টাইগার টিম

 বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনাবলি তদন্তে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই রাতে দায়িত্ব পালন করা টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তদন্তকারীরা।
বিশেষ করে পুলিশের উপস্থিতি, তাহসিফ ও তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কোনো কথা হয়েছিল কি না এবং ওই ঘটনায় তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই রাতে মাজার বস্তি এলাকায় টঙ্গী পশ্চিম থানার তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করছিল পুলিশের ‘টাইগার টিম’।
তিনজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও পাঁচজন কনস্টেবল নিয়ে গঠিত দলটি ওই এলাকায় পায়ে হেঁটে টহল দিচ্ছিল। তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে সেদিন দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানার তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তার দায়িত্বে বাইরে মোতায়েন করা পুলিশ সদস্যদের দলগুলোর আলাদা নাম থাকে। যেমন-পেট্রোল, শিরা ও কিলো।
একইভাবে সেদিন টঙ্গী পশ্চিম থানার তত্ত্বাবধানে মাজার বস্তি এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিল টাইগার টিম।

মাজার বস্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের স্থান হিসেবে পরিচিত। সেখানে নিয়মিত পুলিশি টহল ও অভিযান পরিচালিত হয়। সূত্রের দাবি, আগের তুলনায় এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের প্রবণতা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়ায় রাতে সেখানে অপরিচিত কাউকে দেখলে পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা স্বাভাবিক বিষয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই রাতে তাহসিফ ও দীপ ছাড়াও মাঠে আরও কয়েকজনের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে মাদক কারবারি ও মাদকসেবী থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পরিচয় ও ভূমিকা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। এ বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনাটি নৌ-পুলিশ তদন্ত করছে। এ বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার কিছু বলার নেই। যেকোনো তথ্যের জন্য নৌ-পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

তবে একপর্যায়ে ওসি বলেন, মাজার বস্তিতে সেদিন যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ছিলেন, তারা প্রতিদিনের মতো বর্তমানে থানার রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে নৌ-পুলিশ করবে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না। এসব বিষয়ে নৌ-পুলিশই বলতে পারবে।

অন্যদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেদিন দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কথা হয়েছে। তবে নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিস্তারিত ও আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রয়োজনে তদন্ত কর্মকর্তা তাদের একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।

মামলার সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। তার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে টহল পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে কারা তাদের ধাওয়া করেছিলেন, নাকি আদৌ ধাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেছিল, পুলিশের উপস্থিতি দেখে তারা কী করেছিলেন এবং তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

রিমান্ডে থাকা দীপের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের বর্ণনায় কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি ওই রাতে মাঠে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে সময় কাটান তাহসিফ। সেখানে তার বান্ধবী দিশাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন দীপ। পরে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে তাহসিফ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে দীপের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

একপর্যায়ে হেরোইন খোঁজার উদ্দেশ্যে দীপকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান তাহসিফ। দীপের দাবি, সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় কিছু লোক তাদের ধাওয়া করে। এ সময় তারা দুদিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। দীপ পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পরে তাহসিফের খোঁজ আর পাননি।

তদন্তের পাশাপাশি তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়। মর্গসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মরদেহের ফুসফুসে পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার পরনের কাপড় এবং হাত-পায়ের বিভিন্ন স্থানে কাদামাটি ছিল। পানিতে পড়লে বা ডুবে গেলে শরীরে এ ধরনের আলামত থাকতে পারে।

মরদেহে মাদকের কোনো উপাদান ছিল কি না, তা পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা, কিডনি, যকৃৎ ও পাকস্থলী থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর ফরেনসিক চিকিৎসকেরা ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করবেন। পরে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মর্গসংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রাথমিক ধারণা, মৃত্যুর আনুমানিক ১২ ঘণ্টা পর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পরীক্ষার ফলাফল ও ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে নৌ-পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও বান্ধবী দিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজনকেই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। 

জেএইচ

Link copied!