অভাবের সংসারে টানাপোড়েন ছিল। তাই চট্টগ্রামের পরিচিত জীবন ছেড়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে স্থায়ীভাবে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আজহারুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল, বাড়িতে গিয়ে ছয় বছরের ছেলে রাকিবকে নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি করাবেন। গ্রামের সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা করবে, বড় হবে, একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে—এমন কত স্বপ্নই না বুনেছিলেন এই বাবা।
কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে লরির ধাক্কা মুহূর্তেই সব শেষ করে দিল। বাড়ি ফেরার সেই যাত্রায় রাকিব ফিরল না আর। ফিরতে হলো তার নিথর দেহ নিয়ে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে বসে আছেন আজহারুল। পাশে স্ত্রী ফাতেমা বেগম। দুজনের শরীরেই দুর্ঘটনার ক্ষত, বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও অসহনীয় হয়ে উঠেছে একমাত্র ছেলেকে হারানোর বেদনা।
সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট রাকিবের লাশের অপেক্ষায় বারবার বিলাপ করছেন মা। ছেলের নাম ধরে ডাকছেন, যেন সেই ডাক শুনে আবার ফিরে আসবে আদরের সন্তান। কিন্তু ছয় বছরের রাকিবের আর ফেরা হবে না।
সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের যাত্রীদের পেছন থেকে একটি লরি চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিল রাকিবও। দুর্ঘটনায় আহত হন তার বাবা-মা।
আজহারুল পেশায় অটোরিকশাচালক। প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা স্টিলমিল এলাকার নারিকেল তলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। অভাবের সংসারে বড় মেয়ে সাদিয়া আক্তার (১৫) একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেয়েকে চট্টগ্রামে রেখেই স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করেছিলেন আজহারুল।
তাদের গন্তব্য ছিল নেত্রকোনার মদন থানার শিবাশ্রম গ্রাম। পতেঙ্গা স্টিলমিল এলাকার নারিকেল তলা থেকে ছেড়ে যাওয়া নেত্রকোনাগামী শাপলা বাসে উঠেছিলেন তারা।
রাকিব স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ত। গ্রামে ফিরে তাকে নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর ইচ্ছা ছিল বাবার। নতুন পরিবেশে সহপাঠীদের সঙ্গে পড়বে—ছোট্ট রাকিবেরও ছিল এমন স্বপ্ন। কিন্তু মহাসড়কের দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্নের সঙ্গে শেষ হয়ে গেল একটি পরিবারের সাজানো ভবিষ্যৎ।
হাসপাতালের মেঝেতে বসে ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আজহারুল। অভাবের সংসার চালাতে না পেরে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এখন সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে করে বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন।
আজহারুল বলেন, “অভাবের সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই বাড়ি ফিরছিলাম। এমন জানলে কষ্ট হলেও চট্টগ্রামে থেকে যেতাম। আমার কলিজার টুকরোকে কে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবে? আমি কার কাছে গেলে শান্তি পাব? আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকব? আল্লাহ আমার ছেলেকে না নিয়ে আমাকে নিয়ে যেতেন।”
মা ফাতেমা বেগমের বুকফাটা কান্নাও থামছে না। ছেলেকে ঘিরে দেখা স্বপ্নগুলোর কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছেন তিনি।
ফাতেমা বলেন, ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। তাকে মানুষের মতো মানুষ করব বলে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কীভাবে এমন হয়ে গেল! আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার তো আর বেঁচে থাকার কিছুই রইল না। আমার সন্তানকে কীভাবে মারল!
তাদের কান্না দেখে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনেরাও। যে বাড়িতে ফেরার কথা ছিল নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে, সেই বাড়িতেই এখন ফিরতে হবে সন্তানের লাশ নিয়ে।
খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন একই গ্রামের বাসিন্দা বিজয় আহমেদ মারুফ। তিনিও চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। বাংলানিউজকে তিনি বলেন, রাকিব ছিল পরিবারের সবার আদরের। তার হাসি ছাড়া ঘরটা শূন্য লাগত। আজ সেই ঘর চিরদিনের জন্য শূন্য হয়ে গেল।
একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিল ছয় বছরের শিশুর প্রাণ, ভেঙে দিল মা-বাবার স্বপ্ন। জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রামে গড়ে তোলা সংসার ছেড়ে গ্রামে ফেরার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার শেষ হলো হাসপাতালের বারান্দায়—এক সন্তানের নিথর দেহ আর এক পরিবারের সীমাহীন শোকের মধ্য দিয়ে।
