মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

বেড়িবাঁধ দখল করে চলছে বসতঘর নির্মাণ, টাকার বিনিময় দখল করে দিচ্ছে তাঁতী দল নেতা

মোঃ ইয়াছিন হাছান, নোয়াখালী

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

বেড়িবাঁধ দখল করে চলছে বসতঘর নির্মাণ, টাকার বিনিময় দখল করে দিচ্ছে তাঁতী দল নেতা

নোয়াখালীর হাতিয়ায় বেড়িবাঁধের জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে মো. হারুন নামে স্থানীয় এক তাঁতী দল নেতার বিরুদ্ধে। সেই জমিতে অবৈধ বসতি গড়তে জনপ্রতি ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার মাটি কেটে ঘর তুলে বসবাসও শুরু করেছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, হাতিয়ার হরণী ইউনিয়নে টাংকির বাজার থেকে চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধের প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশ দখল হয়ে গেছে। দখলকৃত বাঁধের দুপাশে ঝুপড়ি ও টিনের দোচালা-চারচালা ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পরিবার সদ্য মাটি কেটে সেখানে বসতি গড়ে তুলেছে। এসব বসতির মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি ঘরও রয়েছে। সেখানে স্বামীহারা এক নারী তার ছয় ও আট বছর বয়সি দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, অন্য বসতিগুলোর বেশির ভাগই আশপাশের এলাকা থেকে আসা লোকজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপির সহযোগী সংগঠন তাঁতী দলের ওয়ার্ড সভাপতি মো. হারুন ও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা এসব জায়গায় বসতি গড়ে তোলার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এ জন্য ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন হরণী ইউনিয়ন তাঁতী দলের ওয়ার্ড সভাপতি মো. হারুন, একই ইউনিয়নের রহমান আলী ওরফে রহম চৌকিদারের ছেলে নুরনবী বাহিনীর প্রধান নুরনবী এবং ওয়ার্ড বিএনপির সমর্থক আব্দুল বারেক ও আব্দুল বাসেতসহ তাদের সহযোগীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে নদীভাঙন রোধে টাংকির বাজার থেকে দিদার বাজার, চেয়ারম্যানঘাট হয়ে নলের চর পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় চার কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আড়াই কিলোমিটার বাঁধের পাশের জায়গায়ও দখল ও বসতি নির্মাণ চলায় সেটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এদিকে বাধেঁর জন্য দেওয়া জমির মালিকদের দাবি, জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সুরাহা না করেই বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরমধ্যে আবার জমি দখল করে অবৈধ বসতিও গড়ে উঠেছে।

বেড়িবাঁধের পাশের বাসিন্দা যোগেশ চন্দ্র সাহা বলেন, সরকার তার জমির ওপর দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তার অভিযোগ, বিএনপি নেতা হারুন ও নুরনবী ৪০ হাজার টাকা করে নিয়ে ওই বেড়িবাঁধের জমি বন্দোবস্ত দিচ্ছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাকে মারধর করে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভয়ে নিজের বাড়িতে থাকছেন না; অন্যত্র গিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।

নিরুমা রানী সাহা নামের এক বৃদ্ধা বলেন, জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে নতুন করে ঘর তুলে জমি দখল করা হচ্ছে। এতে তিনি নিজের খতিয়ানভুক্ত জমি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। সবশেষ জমি দখল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নুরনবীসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগও দিয়েছি। একজন এসআই অভিযোগটি তদন্ত করছেন।

অভিযোগের বিষয়ে তাঁতী দল নেতা মো. হারুন বলেন, বেড়িবাঁধের পাশের জমি দখল করে কাউকে বসতি গড়ার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা এজন্য টাকা নেওয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তার দাবি, শ্রমিক হিসেবে মাটি কাটার কাজ করতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। দুই দিন মাটি কাটার কাজ করার পর তৃতীয় দিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। দলের কিছু লোক তার বিরুদ্ধে লেগেছে।

ইউনিয়ন তাঁতী দলের সভাপতি মো. আলমগীর বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে পরিদর্শন করব। অভিযোগের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাউকে দলে রাখা হবে না।

স্থানীয় বিএনপির সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান দোলন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি জানার পর তিনি সরেজমিনে গিয়ে অভিযুক্ত নুরনবীকে এলাকা ছাড়া করেছেন। তাঁতী দলের সভাপতি হারুনের বিষয়ে দলীয় তদন্ত চলছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাতিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ পাটোয়ারী বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ওই এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে ব্লক নির্মাণের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নদী ও বেড়িবাঁধের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ব্লক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ওই এলাকায় দখলকৃত বাড়িঘর থাকবে না। তবে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

জেএইচ

Link copied!