সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬

চাঁদাবাজি থেকে গুম-খুন: যেভাবে ‘সন্ত্রাসী এসপি’তে পরিণত হয়েছিলেন সাবেক ডিআইজি আনিসুর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম

চাঁদাবাজি থেকে গুম-খুন: যেভাবে ‘সন্ত্রাসী এসপি’তে পরিণত হয়েছিলেন সাবেক ডিআইজি আনিসুর

যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) ও রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমানকে সরকার চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে তিনি লাপাত্তা। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। 

আনিসুর ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত যশোরের পুলিশ সুপার ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘সন্ত্রাসী এসপি’ নামে পরিচিত ছিলেন। তার আমলে খুন, গুম, ক্রসফায়ার, মিথ্যা মামলা ও চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

তার শাস্তির দাবিতে অন্তত আটটি মামলা হয়েছে। খুন, গুম ও গুলি করে পঙ্গু করার অভিযোগে হওয়া এসব মামলার তদন্ত ও বিচার চলছে। অন্যদিকে, তার নির্দেশে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে যারা অভিযোগ করছেন, তাদের কয়েকটি পরিবার আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে।

ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে চারটি মামলা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আনিসুরের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা ও পঙ্গু করার অভিযোগ আছে। তখন ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। রাজনৈতিক পট বদলের পর এ নিয়ে এখন পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট মনিরামপুরের জয়পুরের আবু সাঈদকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা হয়। এতে আনিসুরসহ আটজন আসামি। ওই বছরের ২১ আগস্ট একই গ্রামের পল্লিচিকিৎসক বজলুর রহমান ও আনিসুর রহমানকে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। মনিরামপুরের তাহেরপুরের ইউসুফ আলীকে ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনায়ও মামলা আছে। এতে আনিসুরসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আসামি।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ ইকবাল বলেন, ‘চারটি মামলায় সাবেক এসপি আনিসুর রহমানসহ পুলিশ ও আ.লীগের নেতাকর্মীরা আসামি। এসব মামলার তদন্ত চলছে।’

ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলি
২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর দাবিতে আন্দোলন চলছিল। তখন যশোরের চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে পুলিশ গুলি করে বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় আনিসুরসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, ‘বর্তমানে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করি।’

তিনজনকে গুমের অভিযোগ
পিরোজপুরের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল সাইদুর রহমান ও শাওন নামের দুই যুবককে যশোরের পৌর পার্ক থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় তৎকালীন এসপি আনিসুরসহ ১০ জনের নামে মামলা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট বিএনপির কর্মী মাসুমকে যশোর শহরের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগেও আনিসুরের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা হয়েছে।

জঙ্গি অভিযোগে হয়রানি, ৯ বছর পর খালাস
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, জঙ্গি দমনের নামে আনিসুর নাটকীয় পরিবেশ তৈরি করতেন। অভিযানের নামে মিডিয়ার সামনে আটক দেখিয়ে মামলা দিতেন। এমন অভিযানে চারজনের পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। ৯ বছর পর জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজল।

২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন ডিবি হেফাজতে রাখা হয় বলে অভিযোগ। তার চোখ বাঁধা অবস্থায় অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে তাকে জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত তাকে মামলা থেকে খালাস দেন। তার আইনজীবী মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, ‘আসামিকে নির্দোষ প্রমাণের সব রকমের চেষ্টা করেছি। আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় খালাস পেয়েছেন।’

প্রতিবাদ করায় মানবাধিকারকর্মীও মামলায়
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আনিসুরের নির্দেশে রাতে যশোর শহরের গাড়িখানা রোডের ৪০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে পুলিশ। লুটপাটেরও অভিযোগ আছে। এর প্রতিবাদ করায় ২০১৭ সালে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিককে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার ছেলেকেও মাদকের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।

বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘আনিস সন্ত্রাসী এসপি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তার নির্যাতনে কেউ রেহাই পাননি। যশোরকে পুলিশি ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করেছিলেন। তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জেলে গেছি। আমার ছেলেকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। তার দায়িত্বকালে যশোরে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে।’

এম/আর

Link copied!