বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬

লাইসেন্সহীন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে সয়লাব যশোর নামমাত্র জরিমানায় পার পাচ্ছেন মালিকরা

যশোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

লাইসেন্সহীন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে সয়লাব যশোর নামমাত্র জরিমানায় পার পাচ্ছেন মালিকরা

* পরিবেশ ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ক্লিনিক ব্যবসা
* যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযান
* স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ রোগীরা
* নিয়ম না মেনেই বছরের পর বছর চলছে ক্লিনিক ব্যবসা
* যশোরে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযান
* জরিমানাই মালিকদের অবৈধ লাইসেন্স

যশোর শহরে লাইসেন্সহীন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সয়লাব। এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশের পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও ফায়ার সার্ভিসের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সর ছাড়পত্র নেই। এ ভাবেই প্রশাসনকে বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে বছরের পর বছর চলছে কার্যক্রম। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নামমাত্র জরিমানা দিয়েই আবার ব্যবসা চালু রাখছে মালিকপক্ষ। স্থানীয়রা বলছেন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নীরবতায় সাধারণ রোগীরা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিম বিনতে মুস্তাফিজ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার নবনীতা যৌথভাবে দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালান।

এসময় ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উপযুক্ত পরিবেশ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও ফায়ার সার্ভিসের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ছাড়পত্র না থাকা এবং কথিত ভুয়া চিকিৎসক মতিয়ার রহমানের চেম্বার করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযানের খবর পেয়ে ভুয়া চিকিৎসক মতিয়ার রহমান চেম্বার ছেড়ে পালিয়ে যান।

অন্যদিকে লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কোনো প্যাথলজি ল্যাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগের দুটি সরকারি টিকিট উদ্ধার হয়। মালিকপক্ষের কাউকে না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মনির হাসানের অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে জানা গেছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিম বিনতে মুস্তাফিজ অভিযান শেষে বলেন, ‘লাইফ কেয়ারে প্যাথলজি ল্যাব নেই এবং সেখানে সরকারি হাসপাতালের টিকিট পাওয়া গেছে। এ কারণে তালাবদ্ধ করা হয়েছে। প্রিন্স ডায়াগনস্টিকে উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এবং ভুয়া চিকিৎসকের চেম্বারের বিষয় বিবেচনায় ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দৈনিক সুবর্ণসূমিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারবার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে। মাঝে মাঝে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও সামান্য জরিমানা দিয়েই মালিকরা পার পেয়ে যান। জরিমানাকে অনেকেই ‘অবৈধ ব্যবসা সচল রাখার লাইসেন্স’ হিসেবে দেখছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেডিনোভা হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অর্থোপেডিক্স কেয়ার, পদ্মা নার্সিং হোম, ল্যাবএইড, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হসপিটাল, ম্যাক্স হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আস্থা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সানরাইজ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তার বাড়ি, আল হায়াত, আল শেফা, ডক্টরস ল্যাব এবং মেডিল্যাব হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ম না মেনে সেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা দিতে পরমাণু শক্তি কমিশনের ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের এবং অগ্নি নিরাপত্তার জন্য ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই এসব কাগজপত্র নেই। লাইসেন্সবিহীন এক্স-রে ও ল্যাব থেকে ক্ষতিকর বিকিরণ এবং অপরিকল্পিত মেডিকেল বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি সেবার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা মানসম্মত ও নিয়মতান্ত্রিক হতে হবে। বর্তমানে দালালচক্র রোগীদের ফুসলিয়ে এসব ভুঁইফোড় ক্লিনিকে নিয়ে আসছে। রোগীরা মানসম্মত সেবা না পেয়ে শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, আর লাভবান হচ্ছেন মালিক ও দালালরা।

যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোড় এলাকার বাসিন্দ মাহাফুজুর রহমান দাবি, অবিলম্বে লাইসেন্সবিহীন ও মানহীন এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালিয়ে স্থায়ীভাবে সিলগালা করা হোক এবং স্বাস্থ্য খাতকে দালালমুক্ত করে নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

যশোর সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, প্রায় অভিযান চালানো হয়। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ করার ক্ষমতা জেলা স্বাস্থ বিভাগের নেই। সিভিল সার্জন অফিস শুধুমাত্র তদারকি করতে পারে। বাকি সকল ক্ষমতা স্বাস্থ অধিদপ্তরের।#

 

দৈনিক মুক্তবাণী

Link copied!