ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম আবার সামনে। উপকূলের মানুষের জন্য এর অর্থ শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা নয়; বরং সতর্কসংকেত পাওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রস্তুত রাখার এক কঠিন পরীক্ষা। ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য—আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক প্রস্তুতি ব্যবস্থা বিশ্বজুড়েই প্রশংসিত। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে স্থানীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। দুর্যোগের সময় খাদ্য, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য সরকারি বরাদ্দের ব্যবস্থা থাকলেও, দুর্যোগ আঘাত হানার আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে তাৎক্ষণিক ব্যয়যোগ্য অর্থের সুযোগ সীমিত। অথচ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সাফল্য অনেকটাই নির্ধারিত হয় আঘাত হানার পর কী করা হলো তার চেয়ে, আঘাত হানার আগে কতটা প্রস্তুতি নেওয়া গেল তার ওপর।
দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশ ২০১৯-এর আওতায় বাংলাদেশ জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে এসব কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি মূল্যায়ন, সতর্কবার্তা প্রচার, প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠিত করা, জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম সমন্বয় করা। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানার আগের দিন ও ঘণ্টাগুলোতে এসব দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু সম্পদ ছাড়া শুধু দায়িত্ব অর্পণের সীমাবদ্ধতা সুস্পষ্ট। এসব স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মহড়া, মৌলিক সরঞ্জাম এবং কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন, এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করে আসছে। এসব অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ কোনো ইউনিয়ন বা উপজেলার মৌলিক দুর্যোগ প্রস্তুতি সেখানে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প চালু আছে কি না, তার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
আরো গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হলো দুর্যোগ প্রস্তুতিতে অর্থায়নের ঘাটতি। জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর অথবা মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পর খাদ্য বিতরণ ও অন্যান্য তাৎক্ষণিক ত্রাণসহায়তায় সরকারি সম্পদ এবং বরাদ্দের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। অথচ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই স্থানীয় কমিটিগুলোর জন্য সীমিত হলেও পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত অর্থের প্রয়োজন। সহজে ব্যবহারযোগ্য আপৎকালীন তহবিল না থাকলে অনেক সাধারণ কিন্তু সম্ভাব্য জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পর সাড়াদানকেন্দ্রিক অর্থায়নের পাশাপাশি প্রস্তুতি ও আগাম কার্যক্রমে অর্থায়ন জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার প্রতি ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের আগে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জেলা ও উপজেলায় ঝুঁকিভিত্তিক আপৎকালীন বরাদ্দ দিয়ে থাকে। তবে এসব বরাদ্দ মূলত জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সাড়াদান কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। তাই বাস্তব প্রশ্ন হলো—ঝুঁকিপ্রবণ এলাকাগুলোতে এমন কোনো পূর্বনির্ধারিত ও আগাম বরাদ্দ করা তহবিল রয়েছে কি না, যা দুর্যোগের আগে অথবা দুর্যোগ চলাকালে স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।
কক্সবাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানবিক সহায়তা সংস্থা ও এনজিও কাজ করছে। ফলে এ ধরনের উদ্যোগ পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই জেলার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। উন্নয়ন সহযোগীরা এরই মধ্যে সরকারের নেতৃত্বাধীন দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে অবদান রাখছে। তবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের তহবিলে আপৎকালীন অর্থায়নের ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে, যেখানে তহবিল সক্রিয়করণ, ব্যয় এবং হিসাব সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর থাকবে। একটি বাস্তবসম্মত ও মানসম্মত পদ্ধতি এনজিওগুলোর সীমিত সম্পদকে সময়োপযোগী স্থানীয় কার্যক্রমে রূপান্তর করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে সহায়তার ক্ষেত্রেও মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে আরো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুকনো খাবারের প্যাকেট সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যায় বলে এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে যেখানে অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা অনুকূলে রয়েছে, সেখানে নিরাপদ খাবার পানি এবং স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দীর্ঘ সময় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী পরিবারের জন্য এ ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব সহায়তার পাশাপাশি আগাম নগদ সহায়তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নিরাপদ স্থানে সরে যেতেও অর্থের প্রয়োজন হয়। দরিদ্র পরিবারকে পরিবহন, ওষুধ, খাবার, পানীয়জল কিংবা গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার খরচ বহন করতে হয়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থা আগাম নগদ সহায়তার সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এ ধরনের সহায়তা দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই ঝুঁকিপ্রবণ পরিবারগুলোকে তাদের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ দেয়। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া ঝুঁকিপ্রবণ পরিবারগুলোর জন্য পূর্বনির্ধারিত নগদ সহায়তার একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
তাই আসন্ন ঘূর্ণিঝড় মৌসুমকে শুধু আরেকটি জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থার পরীক্ষা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ করছে, তারও পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশে এরই মধ্যে একটি বিস্তৃত ও শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো রয়েছে। এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে প্রশিক্ষিত জনবল, সুস্পষ্ট কার্যপদ্ধতি এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করা, যাতে এই কাঠামো বাস্তবে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
দুর্যোগ প্রস্তুতি তখনই সফল হয়, যখন ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই অর্থ, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ যথাস্থানে প্রস্তুত থাকে; ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর নয়।
লেখক: পলিসি প্র্যাকটিশনার, সিআইপিজি
